কেন মিলছে না বীমার টাকা: জানুন আইনি অধিকার ও করণীয়

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের বীমা খাত গত এক দশকে আকারে বড় হলেও গ্রাহকের আস্থা এখনও নড়বড়ে। পলিসির মেয়াদ শেষে বা দুর্ঘটনার পর ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা, জটিলতা এবং হয়রানির অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, লাখ লাখ পলিসিধারী এখনও তাদের প্রাপ্য অর্থের জন্য অপেক্ষায়- যা খাতটির গভীর সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়।

৯০ দিনের নিয়ম থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন

বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সব নথি জমা দেয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে দাবি নিষ্পত্তি করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে এই সময়সীমা অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না।

২০২৩ সালে প্রায় ২৯টি বীমা কোম্পানির কাছে ১০ লাখ পলিসিধারীর ৩,০৫০ কোটি টাকার দাবি বকেয়া ছিল। এরপর পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে গেছে। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ গ্রাহক তাদের পাওনা পাননি এবং ৩২টি কোম্পানি দাবি পরিশোধে চাপের মুখে রয়েছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত অপরিশোধিত দাবির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪,৪০৩ কোটি টাকায়।

কেন বাড়ছে সংকট

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে আর্থিক অনিয়ম, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, অতিরিক্ত পরিচালন ব্যয় এবং অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা প্রধান।

তারল্য সংকটে পড়া অনেক কোম্পানি এখন সম্পদ বিক্রি, ঋণ গ্রহণ এবং পুনরুদ্ধার পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে। তবে দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকি সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কমছে দাবি নিষ্পত্তির হার

গত এক বছরে লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো মোট ৮,৭৫৪ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করেছে, যা মোট দাবির ৬৬.০৬ শতাংশ। এই হার ২০২০ সালে ছিল ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ কয়েক বছরের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে দাবি নিষ্পত্তির হার।

অন্যদিকে, বৈশ্বিক গড় যেখানে প্রায় ৯৭-৯৮ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও এই হার প্রায় ৯৮ শতাংশ।

‘ফাইন প্রিন্ট’ ও তথ্যঘাটতি বড় বাধা

বীমা চুক্তির জটিল শর্তাবলি বা ‘ফাইন প্রিন্ট’ অনেক গ্রাহকের জন্য বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে সামান্য তথ্যগত ভুল বা অসম্পূর্ণ কাগজপত্রের কারণে দাবি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চিকিৎসা রিপোর্ট, মৃত্যুর সনদ বা দুর্ঘটনার এফআইআরসহ প্রয়োজনীয় নথি সঠিকভাবে প্রস্তুত না থাকলে কোম্পানিগুলো সহজেই দাবি নাকচ করতে পারে।

আইনি সহায়তা ও বিকল্প সমাধান

এই জটিল পরিস্থিতিতে আইনজীবীদের ভূমিকা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তারা পলিসির শর্ত বিশ্লেষণ, দলিল যাচাই এবং সঠিকভাবে দাবি দাখিলে সহায়তা করেন।

দীর্ঘ আদালত প্রক্রিয়া এড়াতে বর্তমানে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর), বিশেষ করে মধ্যস্থতার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা বাড়ছে। এছাড়া বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর কাছে অভিযোগ জানিয়ে সমাধান চাওয়ার সুযোগও রয়েছে।

সফলতার উদাহরণ, তবু বৈষম্য রয়ে গেছে

খাতের সামগ্রিক দুর্বলতার মধ্যেও কিছু কোম্পানি ভালো পারফরম্যান্স দেখাচ্ছে। ২০২৪ সালে মেটলাইফ বাংলাদেশ ২,৮৯৫ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করে শীর্ষে রয়েছে এবং ৯৭.৭৯ শতাংশ নিষ্পত্তির হার বজায় রেখেছে।

তবে অনেক স্থানীয় কোম্পানির বিরুদ্ধে নামমাত্র অর্থ প্রদান বা বিলম্বের অভিযোগ রয়েছে, যা খাতে বৈষম্যকে আরও স্পষ্ট করে।

নতুন ধরনের জটিলতা

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা বা গণআন্দোলনের পর ক্ষয়ক্ষতির বীমা দাবি নিয়েও নতুন জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক কোম্পানি এসব ঘটনাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে দাবি পরিশোধে অনীহা দেখাচ্ছে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে স্পষ্ট আইনি ব্যাখ্যা ছাড়া গ্রাহকের পক্ষে ন্যায্য পাওনা আদায় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বীমা দাবি কেবল অর্থ পাওয়ার বিষয় নয়, এটি গ্রাহকের একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, সেই অধিকার আদায়ে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সচেতনতা, সঠিক তথ্য প্রদান এবং প্রয়োজনে আইনি সহায়তা গ্রহণ- এই তিনটি বিষয় নিশ্চিত করতে পারলে গ্রাহকরা অনেকাংশে হয়রানি থেকে মুক্তি পেতে পারেন। পাশাপাশি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এই সংকট থেকে উত্তরণ কঠিন হবে।