জীবন বীমায় জেনেটিক-টেস্টের ফল ব্যবহার বন্ধে অস্ট্রেলিয়ার নতুন আইন প্রস্তাব

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: অস্ট্রেলিয়া সরকার জীবন বীমা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে একটি নতুন আইন প্রস্তাব করেছে, যার লক্ষ্য জীবন বীমা আন্ডাররাইটিংয়ে পূর্বাভাসমূলক বা ‘প্রতিকূল’ জেনেটিক-টেস্টের ফলাফল ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা। বিলটি কার্যকর হলে সেই তারিখের পর থেকে যে সমস্ত জীবন বীমা চুক্তি সম্পাদিত হবে, তাদের বীমা অনুমোদন ও প্রিমিয়াম নির্ধারণে কোনো ধরনের জেনেটিক ঝুঁকি-তথ্য আর বিবেচনায় নেয়া যাবে না। সরকারের মতে, এটি মানুষের স্বাস্থ্য-সচেতনতা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা এবং আর্থিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতির একটি যুগান্তকারী প্রকাশ।
সহকারী কোষাধ্যক্ষ ও আর্থিক পরিষেবা মন্ত্রী ড. ড্যানিয়েল মুলিনো বলেছেন, সরকার এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে চায় যেখানে মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানতে এবং আগেভাগে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে জেনেটিক পরীক্ষা করাতে আত্মবিশ্বাসী হবে। তিনি মনে করেন, বীমা হারানোর আশঙ্কা বা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ার ভয় মানুষকে জেনেটিক পরীক্ষা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে তা জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। তাই স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
প্রতিকূল জেনেটিক-টেস্টের ফল বলতে এমন জিনগত তথ্যকে বোঝায়, যা কোনো ব্যক্তির ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাকে গড়ের চেয়ে বেশি বলে ইঙ্গিত করে- যদিও তিনি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ থাকতে পারেন। এই তথ্য চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক পরিচর্যার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বীমা শিল্পে তা ব্যবহার করলে মানুষের প্রতি বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এই কারণেই অস্ট্রেলিয়া সরকার এমন তথ্যকে আন্ডাররাইটিংয়ের প্রক্রিয়া থেকে আইনগতভাবে বাদ দিতে চাইছে।
বিলটি প্রস্তুতের আগে সরকার সমাজের বিভিন্ন অংশীদারের মতামত নিয়েছে- যেমন চিকিৎসক, জেনেটিক বিশেষজ্ঞ, গবেষক, ভোক্তা অধিকার সংস্থা এবং বীমা শিল্প। এসব আলোচনা থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়েছে: জেনেটিক বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুললেও এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও বাড়ছে। ফলে আইনি সুরক্ষা ছাড়া জেনেটিক তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রটি মানুষের অধিকার ও আস্থার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার জীবন বীমা শিল্পের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান সিএএলআই এই বিলকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে। সংস্থার প্রধান নির্বাহী ক্রিস্টিন কুপিট বলেছেন, এটি মানুষের স্বাস্থ্য-সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি জেনেটিক গবেষণা ও চিকিৎসা-উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করবে। তার মতে, কেউ যেন ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে জেনেটিক পরীক্ষা করাতে গিয়ে জীবন বীমা হারানোর ভয়ে পিছিয়ে না যায়। বীমা শিল্পও চায় মানুষ তাদের ঝুঁকি জানুক, সময়মতো পরীক্ষা করুক এবং প্রয়োজন হলে প্রতিরোধমূলক চিকিৎসা গ্রহণ করুক- যা দীর্ঘমেয়াদে সবার জন্যই ভালো।
এর আগেও অস্ট্রেলিয়ার বীমা শিল্প ২০১৯ সালে একটি স্বেচ্ছাবাধ্য মানদণ্ড চালু করেছিল, যেখানে জেনেটিক-টেস্টের ফল ব্যবহার সীমাবদ্ধ করা হয়। তবে যেহেতু সেটি ছিল শিল্প-নিয়ন্ত্রিত উদ্যোগ, আইনগত বাধ্যবাধকতা ছিল না। এবার সরকারের প্রস্তাব সেই উদ্যোগকে একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো দিচ্ছে, যাতে ভোক্তা অধিকার আরও সুরক্ষিত হয় এবং সব কোম্পানিকে একই নিয়ম মেনে চলতে হয়।
জেনেটিক বিজ্ঞানের গতি এত দ্রুত যে আজ যে পরীক্ষা নিখুঁত বলে মনে হচ্ছে, পাঁচ বছর পর তা হয়তো পুরোনো হয়ে যাবে বা নতুন ধরনের আরও উন্নত পরীক্ষা চালু হবে। এই বাস্তবতার কথা চিন্তা করেই বিলটিতে পাঁচ বছর পর আইন পর্যালোচনার বাধ্যতামূলক শর্ত রাখা হয়েছে, যাতে নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে আইন নিজেকে মানিয়ে নিতে পারে।
এই বিল কার্যকর হলে তার প্রভাব শুধু জীবন বীমা বাজারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা, বায়োমেডিক্যাল উদ্ভাবন, ভোক্তার অধিকার এবং আর্থিক ন্যায়বিচারের ক্ষেত্রেও এর দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। জেনেটিক পরীক্ষার ব্যাপারে মানুষের আস্থা বাড়লে গবেষণায় অংশগ্রহণ বাড়বে, যা নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবনের সম্ভাবনাও বৃদ্ধি করবে। (সংবাদ সূত্র: এশিয়া ইন্স্যুরেন্স রিভিউ)




