ভারতে প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশই স্বাস্থ্য বীমার বাইরে

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের স্বাস্থ্যসুরক্ষা ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধী মানুষের অবস্থান নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে ন্যাশনাল সেন্টার ফর প্রোমোশন অফ এমপ্লয়মেন্ট ফর ডিজেবল্ড পিপল (এনসিপিইডিপি)-এর এক সাম্প্রতিক জাতীয় সমীক্ষা। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে পরিচালিত এই সমীক্ষায় অংশ নিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাঁচ হাজারেরও বেশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। ফলাফল বলছে, ভারতে আনুমানিক ১৬ কোটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের অন্তত ৮০ শতাংশের কোনো ধরনের স্বাস্থ্য বীমা নেই। আরও উদ্বেগের বিষয়, যারা বীমা পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, তাদের মধ্যেও প্রায় ৫৩ শতাংশকে কোনো স্পষ্ট কারণ না দেখিয়ে সরাসরি বঞ্চিত করা হচ্ছে।
এই সমীক্ষার শিরোনাম ‘ইনক্লুসিভ হেলথ কভারেজ ফর অল: ডিসএবিলিটি, ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড হেলথ ইন্স্যুরেন্স ইন ইন্ডিয়া’। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, স্বাস্থ্য বীমা পাওয়ার প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ থেকেই প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা একের পর এক অদৃশ্য দেয়ালে আটকে যাচ্ছেন। বীমা সংস্থাগুলোর আন্ডাররাইটিং নীতিতে এখনও প্রতিবন্ধিতাকে ঝুঁকি হিসেবে দেখে বৈষম্যমূলক সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। অটিজম, মনোসামাজিক প্রতিবন্ধকতা, বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতা এবং থ্যালাসেমিয়ার মতো রক্তজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বীমা বাতিলের হার আরও বেশি- শুধুমাত্র তাদের প্রতিবন্ধিতা বা পূর্ব-বিদ্যমান রোগকেই অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ডিজিটাল বীমা প্ল্যাটফর্মের ব্যবহারযোগ্যতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে সমীক্ষা। অনেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, বিশেষ করে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী বা বৌদ্ধিক প্রতিবন্ধকতাসম্পন্ন মানুষ এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ অধিকাংশ সময় স্ক্রিন রিডার-সহায়ক নয়, তথ্য উপস্থাপনা জটিল এবং বিকল্প সহায়তা ব্যবস্থা নেই। একই সঙ্গে, সরকারি বা বেসরকারি বীমা প্রকল্প সম্পর্কে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে সচেতনতার অভাবও প্রকট; তথ্যের অভাব, ভাষাগত জটিলতা এবং সহায়তাহীনতা তাদের আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।
এনসিপিইডিপি-র নির্বাহী পরিচালক আরমান আলি এই বাস্তবতাকে ভারতের স্বাস্থ্য ও বীমা খাতে বিদ্যমান কাঠামোগত বৈষম্যের নগ্ন চিত্র বলে অভিহিত করেছেন। তার মতে, সংবিধানের সমঅধিকারের নীতি, ২০১৬ সালের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার আইন’ এবং বীমা নিয়ন্ত্রক ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আইআরডিএআই)-এর জারি করা নির্দেশিকা- সবই কাগজে-কলমে থাকা সত্ত্বেও বাস্তবে প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্য বীমা পাওয়ার পথ এখনও বৈষম্য ও বঞ্চনায় ভরা। আলির কথায়, প্রায় ১৬ কোটি প্রতিবন্ধী নাগরিকের জন্য সমতাভিত্তিক বীমা সুবিধা এখনও অধরা থাকা ‘গভীর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার’ স্পষ্ট প্রমাণ।
এই প্রেক্ষাপটে আয়ুষ্মান ভারত-প্রধানমন্ত্রী জন আরোগ্য যোজনা (পিএম-জেএওয়াই)-এর পরিধি প্রসারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তকেও সমীক্ষাটি সমালোচনার চোখে দেখেছে। সরকার যেখানে ৭০ বছর বা তার বেশি বয়সী সকল প্রবীণ নাগরিককে এই সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা প্রকল্পের আওতায় আনছে, সেখানে শারীরিক ও মানসিকভাবে অধিক ঝুঁকির মুখে থাকা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সুস্পষ্টভাবে অগ্রাধিকারভিত্তিতে অন্তর্ভুক্ত না করা নীতিগত দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটির ভাষ্যে, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রবীণদের সমপর্যায়ে, অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকি বহন করলেও, তারা এখনও ‘অদৃশ্য নাগরিক’ হিসেবে নীতিনির্ধারণের টেবিলের বাইরে রয়ে গেছেন।
আইন ও নীতিগত প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার এই ফাঁক কমাতে সমীক্ষাটি কয়েকটি সুস্পষ্ট সুপারিশ সামনে এনেছে। প্রথমত, আয়ুষ্মান ভারত (পিএম-জেএওয়াই)-এর আওতায় আয় বা বয়স নির্বিশেষে সকল প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে অবিলম্বে অন্তর্ভুক্ত করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে, যাতে কোনো অতিরিক্ত শর্ত বা কাগজপত্রের ঝামেলা তাদের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। দ্বিতীয়ত, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, থেরাপি এবং সহায়ক প্রযুক্তি (যেমন হুইলচেয়ার, হেয়ারিং এইড, যোগাযোগে সহায়ক ডিভাইস ইত্যাদি)- কে বীমা কভারেজের মূলধারায় আনার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়েছে, কারণ এগুলো প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাভাবিক ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ।
এছাড়া, আইআরডিএআই-এর ভেতরে একটি বিশেষ ‘ডিসেবিলিটি ইনক্লুশন কমিটি’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে প্রতিবেদনটি, যা বীমা পলিসি ও আন্ডাররাইটিং নীতিমালা প্রণয়নের প্রতিটি পর্যায়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতাকে প্রতিফলিত করবে। একই সঙ্গে বীমা সংস্থা, এজেন্ট, টিপিএ এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিবন্ধিতা-সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ চালুর উপরও গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যাতে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে কাজ করা কর্মীরা সরাসরি বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে বিরত থাকেন এবং প্রতিবন্ধী গ্রাহকদের প্রয়োজনকে সম্মান করেন। (সংবাদ সূত্র: এশিয়া ইন্স্যুরেন্স রিভিউ)




