আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতে লাইফ বীমার প্রিমিয়াম বেড়েছে ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ। কিন্তু একই সময়ে পলিসি বিক্রির কমিশন বেড়েছে ১৮ শতাংশ। কমিশনের এই দ্রুত বৃদ্ধির মধ্যেই বীমা বিক্রির খরচ নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই। ব্যাংক, ব্রোকার ও এজেন্টদের কমিশনে নতুন সীমা আনার কথা বলা হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে গ্রাহকের বীমার খরচ কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
গ্রাহক বীমা কিনে যে প্রিমিয়াম দেন, তার একটি অংশ পলিসি বিক্রি করা ব্যাংক, ব্রোকার বা এজেন্টকে কমিশন হিসেবে দেয় বীমা কোম্পানি। ২৩ সেপ্টেম্বর খসড়া প্রস্তাবটি প্রকাশ করে আইআরডিএআই। এতে কমিশন ও কোম্পানির খরচ কমানোর পাশাপাশি গ্রাহক সুরক্ষায়ও কয়েকটি পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। প্রস্তাবগুলো এখনো চূড়ান্ত নয়। ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিষয়ে মতামত নেয়া হবে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো প্রায় ৬০ হাজার ৮০০ কোটি রুপি কমিশন দিয়েছে। ২০২৩ সালে পণ্যভেদে কমিশনের নির্দিষ্ট সীমা তুলে দিয়ে কোম্পানিগুলোকে বেশি স্বাধীনতা দেয়া হয়েছিল। এবার সেই সীমা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব এসেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, লাইফ বীমায় পলিসির মেয়াদ অনুযায়ী ব্যাংক ও ব্রোকারের প্রথম বছরের কমিশন প্রিমিয়ামের ৫ থেকে ২০ শতাংশ হতে পারে। ব্যক্তিগত এজেন্টদের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ কমিশন ২৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। বর্তমানে কিছু পলিসিতে প্রথম বছরের কমিশন ৪০ শতাংশেরও বেশি।
স্বাস্থ্য বীমায় নতুন পলিসি বিক্রিতে ব্যাংক বা ব্রোকারের কমিশন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং নবায়নের সময় ৫ শতাংশ হতে পারে। ব্যক্তিগত এজেন্টদের ক্ষেত্রেও আলাদা সীমা রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
মোটর বীমাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। নতুন গাড়ির বাধ্যতামূলক থার্ড-পার্টি বীমায় ব্যাংক ও ব্রোকারের মতো প্রতিষ্ঠানকে কমিশন না দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। এই বীমা গাড়ির কারণে অন্য ব্যক্তি বা সম্পদের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেয়। তবে ছোট শহর ও গ্রামে বীমা বিক্রি বাড়াতে বিক্রেতাদের বাড়তি পারিশ্রমিক দেয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।
আইআরডিএআইয়ের মতে, কমিশন বীমার মোট খরচের একটি অংশ। তাই এই খরচ কমলে সাধারণ বীমায় প্রিমিয়াম কমতে পারে বা প্রিমিয়াম বৃদ্ধির গতি কমতে পারে। যেসব লাইফ বীমায় সঞ্চয়ের সুবিধাও থাকে, সেগুলোতে গ্রাহকের রিটার্ন বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে কমিশন কমার পুরো সুবিধা সরাসরি গ্রাহকের কাছে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
ব্যাংকের মাধ্যমে বীমা বিক্রিতেও পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। কোনো ঋণ দেয়ার শর্ত হিসেবে গ্রাহককে নির্দিষ্ট কোম্পানির বীমা কিনতে বাধ্য করা যাবে না। বীমা নিলে কম সুদে ঋণ দেয়ার প্রস্তাব থাকলে ব্যাংককে বীমাসহ ও বীমা ছাড়া, দুই ধরনের সুদের হারই জানাতে হবে। গ্রাহক নিজের পছন্দের কোম্পানি থেকেও প্রয়োজনীয় বীমা নিতে পারবেন।
সংস্কারের আরেকটি লক্ষ্য হলো গ্রাহকের প্রয়োজনের সঙ্গে না মেলা বা বিভ্রান্তিকরভাবে পলিসি বিক্রি কমানো। নিয়ন্ত্রকের উদ্বেগ, বেশি অগ্রিম কমিশন এমন পলিসি বিক্রির আগ্রহ বাড়াতে পারে। নতুন প্রস্তাবে বিক্রেতার পরিচয় পলিসির সঙ্গে যুক্ত রাখা এবং অনিয়ম প্রমাণ হলে সংশ্লিষ্ট কমিশন ফেরত নেয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বীমা কোম্পানির নিজস্ব খরচও ধাপে ধাপে কমানোর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।
তবে কমিশন কমলে বিক্রেতাদের আয় ও পলিসি বিক্রিতেও চাপ পড়তে পারে। ভারতে এখনো এজেন্ট ও ব্যাংক বীমা বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই নতুন নিয়ম চালু হলে স্বল্পমেয়াদে নতুন পলিসি বিক্রি কমার ঝুঁকিও রয়েছে।
প্রস্তাবের প্রভাব শেয়ারবাজারেও দেখা গেছে। ২৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন বীমা প্ল্যাটফর্ম পলিসিবাজারের মূল কোম্পানি পিবি ফিনটেকের শেয়ার এক দিনে ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়।
ভারত বিশ্বের দশম বৃহত্তম বীমা খাত। তারপরও অর্থনীতির আকারের তুলনায় দেশটিতে বীমার ব্যবহার কম। অর্থনীতির আকারের তুলনায় বীমার ব্যবহারকে ‘ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন’ বলা হয়। ভারতে এই হার ৩ দশমিক ৭ শতাংশ, যেখানে বৈশ্বিক গড় প্রায় ৭ শতাংশ।
কমিশন সংস্কারের পাশাপাশি ভারত বীমা খাতে বিদেশি মালিকানার সর্বোচ্চ সীমা ৭৪ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে বাড়িয়েছে। এর লক্ষ্য নতুন বিনিয়োগ ও প্রতিযোগিতা বাড়ানো।
প্রস্তাবটি কার্যকর হলে গ্রাহকের খরচ, পলিসি বিক্রির ধরন এবং বীমার বিস্তারে এর বাস্তব প্রভাব তখনই বোঝা যাবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।