আন্তর্জাতিক ডেস্ক: টেসলার নতুন রোডস্টার গাড়ি বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে মাটি থেকে কিছুটা ওপরে উঠেছে। কিন্তু এ সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বীমার টাকা দেবে কে? যুক্তরাষ্ট্রে গাড়িটির প্রদর্শনের পর এই প্রশ্ন উঠেছে। কারণ প্রচলিত মোটর বীমায় এমন দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে স্পেসএক্সের পরীক্ষাকেন্দ্রে গাড়িটি প্রদর্শন করে টেসলা। এ সময় চালকবিহীন গাড়িটি বিশেষ ব্যবস্থায় উল্টো অবস্থায় চলে। পরে মাটি ছেড়ে ওপরে উঠে ঘুরে আবার নেমে আসে। অন্য কয়েকটি গাড়ির ওপর দিয়েও লাফ দেয়। তবে উড়োজাহাজের মতো দীর্ঘ সময় উড়তে পারবে কি না, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
রোডস্টার হলো বিদ্যুতে চলা একটি স্পোর্টস কার। টেসলা এর তিনটি সংস্করণ আনার পরিকল্পনা জানিয়েছে। প্রথমটি সাধারণ সড়কে চলার জন্য তৈরি। দ্বিতীয়টিতে গতি বাড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে। আর তৃতীয় সংস্করণে গাড়িকে মাটি থেকে ওপরে তোলার প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে। এতে চাপযুক্ত গ্যাস বের করার ১০টি বিশেষ যন্ত্র রয়েছে। এসব যন্ত্রের জন্য নাইট্রোজেন গ্যাস রাখার মোট ৬০০ লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাংক রয়েছে। স্পেসএক্সের সহযোগিতায় প্রযুক্তিটি তৈরি করেছে টেসলা। তবে এই সংস্করণটি সাধারণ সড়কে চালানোর অনুমোদন পায়নি।
টেসলার দাবি, ‘থ্রাস্ট’ সংস্করণটি স্থির অবস্থা থেকে এক সেকেন্ডের কম সময়ে ঘণ্টায় প্রায় ৯৭ কিলোমিটার গতিতে পৌঁছাতে পারবে। নতুন রোডস্টারের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৭০ কিলোমিটারের বেশি এবং একবার চার্জে ৪৮০ কিলোমিটারের বেশি চলার কথাও জানিয়েছে কোম্পানিটি। ২০১৭ সালে প্রথম ঘোষিত গাড়িটি ২০২০ সালে সরবরাহের কথা ছিল। কয়েক দফা পিছিয়ে এখন ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য রয়েছে।
মোটর বীমায় নিজের গাড়ি এবং অন্য মানুষ বা সম্পত্তির ক্ষতির জন্য আলাদা সুরক্ষা থাকে। তবে সব বীমায় দুটি সুবিধাই পাওয়া যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সংগঠন এনএআইসির তথ্য অনুযায়ী, কোন ধরনের ক্ষতি কতটা পর্যন্ত বীমার আওতায় থাকবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ থাকে। ফলে রোডস্টার মাটি ছেড়ে ওঠার সময় দুর্ঘটনায় পড়লে ক্ষতিপূরণ মিলবে কি না, তা বীমার শর্ত ও আইনের ওপর নির্ভর করবে।
গাড়িটি ওপর থেকে পড়ে কোনো মানুষ আহত হলে কিংবা বাড়িঘর ও অন্য গাড়ির ক্ষতি করলে ক্ষতিপূরণের দাবি উঠতে পারে। চালকের ভুলে দুর্ঘটনা ঘটলে তিনি দায়ী হতে পারেন। আবার গাড়ির যন্ত্র বা তৈরিতে ত্রুটি থাকলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকেও দায় নিতে হতে পারে। তবে বীমা কোম্পানি কত টাকা দেবে, তা আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে।
গাড়িটির বিশেষ প্রযুক্তিও নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চাপযুক্ত গ্যাসের ট্যাংক ফেটে যাওয়া, যন্ত্র বিকল হওয়া কিংবা নিয়ন্ত্রণ হারালে বড় ক্ষতি হতে পারে। তবে এসব ঘটনার আশঙ্কা কতটা, তা জানতে আরও পরীক্ষার তথ্য প্রয়োজন।
এমন গাড়ির জন্য শুধু মোটর বীমা যথেষ্ট হবে, নাকি বিমান বীমাও লাগবে, তা এখনো ঠিক হয়নি। বিমান বীমায় উড়োজাহাজের ক্ষতি এবং যাত্রী বা অন্যদের ক্ষতির জন্য সুরক্ষা দেয়া হয়। ফলে রোডস্টারের জন্য দুই ধরনের সুরক্ষা মিলিয়ে বিশেষ বীমা চালুর প্রয়োজন হতে পারে।
বীমার খরচ নির্ধারণও কঠিন হতে পারে। বীমার জন্য গ্রাহক যে টাকা দেন, তাকে প্রিমিয়াম বলা হয়। সাধারণত গাড়ির দাম, ব্যবহার ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বিবেচনায় এই টাকা নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু রোডস্টারের মতো গাড়ির দুর্ঘটনার পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ফলে প্রিমিয়াম নির্ধারণে গাড়িটির নিরাপত্তা ও পরীক্ষার ফল বিবেচনা করতে হবে।
গাড়িটি চালানোর অনুমোদন নিয়েও জটিলতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এফএএ জানিয়েছে, প্রদর্শিত রোডস্টারকে বর্তমানে উড়োজাহাজ হিসেবে ধরা হচ্ছে না। তবে এর অর্থ এই নয় যে গাড়িটি ওড়ার অনুমোদন পেয়েছে। ভবিষ্যতে এ জন্য আলাদা অনুমোদন ও চালকের বিশেষ প্রশিক্ষণ প্রয়োজন হতে পারে। গাড়িটিকে কোন ধরনের যান হিসেবে বিবেচনা করা হবে, তার ওপর বীমার নিয়মও নির্ভর করতে পারে।
বড় দুর্ঘটনায় অনেক টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হলে বীমা কোম্পানির ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে পুনর্বীমা কাজে আসে। এর মাধ্যমে একটি বীমা কোম্পানি বড় ক্ষতির ঝুঁকির কিছু অংশ অন্য বীমা বা পুনর্বীমা কোম্পানির সঙ্গে ভাগ করে নেয়। রোডস্টারের ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থার প্রয়োজন হতে পারে।
উড়ন্ত গাড়ির বীমা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা আগেই শুরু হয়েছে। চলতি বছরের ২ জানুয়ারি প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বীমা তথ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক জানায়, এসব গাড়ির উচ্চমূল্য ও দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণ বীমাকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এখন পর্যন্ত রোডস্টারের বিশেষ প্রযুক্তির জন্য নির্দিষ্ট বীমা বা প্রিমিয়াম ঘোষণার তথ্য পাওয়া যায়নি। টেসলা ২০২৮ সালে উৎপাদন শুরুর লক্ষ্য জানালেও গাড়িটির সাধারণ ব্যবহারের আগে নিরাপত্তা ও সরকারি অনুমোদন প্রয়োজন হবে। নতুন এই প্রযুক্তি বীমা কোম্পানিগুলোর জন্য ব্যবসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ কীভাবে দেয়া হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।