বিশ্ব জীবন বীমা বাজারে কম প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বিশ্ব জীবন বীমা শিল্প একটি গভীর কাঠামোগত পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে- যেখানে বহু দশক ধরে কার্যকর থাকা লাইফ ইন্স্যুরেন্স মডেলটি আর এককভাবে বাজারের চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। জনমিতিক পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের দ্রুত বদলে যাওয়া প্রত্যাশা মিলিয়ে জীবন বীমার মূল প্রস্তাব- শুধু মৃত্যুর পর আর্থিক সুরক্ষা- ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে। বিশ্বখ্যাত বহুজাতিক প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পরামর্শ প্রতিষ্ঠান ক্যাপজেমিনি প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্স রিপোর্ট ২০২৬ এই বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে বলছে, বাজারে নতুন প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা এখন ‘ইন্স্যুরেন্স ফর লিভিং’- অর্থাৎ এমন বীমা, যা গ্রাহকের জীবিত অবস্থাতেই দৃশ্যমান, ব্যবহারযোগ্য এবং তাৎক্ষণিক মূল্য প্রদান করে।
প্রতিবেদনটির তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ জীবন বীমার অবস্থানকে একযোগে দুই দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছে- গ্রাহক মানসিকতার রূপান্তর এবং শিল্পের কৌশলগত সংকট। গত ১৫ বছরে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ পোর্টফোলিওতে জীবন বীমা সম্পদের অংশীদারিত্ব বড় আকারে কমে যাওয়ার বিষয়টি কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি ইঙ্গিত করে যে গ্রাহকরা ঐতিহ্যগত জীবন বীমাকে ক্রমেই একটি কম-আকর্ষণীয় আর্থিক সম্পদ হিসেবে দেখছেন। কারণ তারা এখন এমন সমাধান চান, যা তাদের জীবনের বর্তমান বাস্তবতায় সরাসরি কাজে লাগে- স্বাস্থ্য, আর্থিক স্থিতি, জীবনযাত্রার মান এবং দৈনন্দিন ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ বাজারের প্রবৃদ্ধি নিয়েও প্রতিবেদনিটি সতর্ক করে দিয়েছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০৪০ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জীবন বীমা প্রিমিয়ামের গড় প্রবৃদ্ধি খুব কম থাকবে, যা শিল্পের জন্য একটি কঠিন বার্তা: নতুন মূল্য না তৈরি করলে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর আয় বৃদ্ধির ঐতিহ্যগত পথ সংকুচিত হয়ে যাবে।
এই গবেষণা কেবল একটি অঞ্চলের চিত্র নয়; এটি বৈশ্বিক। ১৮ দেশের ৪০ বছরের কম বয়সী ৬,১৭৬ জন বীমা গ্রাহকের মতামত এবং শীর্ষ জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানের ২০০ জন সিনিয়র নির্বাহীর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছে। আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়া-প্যাসিফিক- এই তিন অঞ্চলের অভিজ্ঞতা একত্র করে এটি দেখিয়েছে যে জীবন বীমার সমস্যাটি কোনো একক বাজারের নয়; এটি একটি বৈশ্বিক ট্রেন্ড। একই সঙ্গে ম্যাক্রো অর্থনৈতিক পূর্বাভাসের সংযোগ এই প্রতিবেদনকে আরও বাস্তবমুখী করেছে- কারণ অর্থনীতির বৃহত্তর পরিবর্তন কীভাবে জীবন বীমার চাহিদা, সঞ্চয় প্রবণতা এবং বিনিয়োগ আচরণকে প্রভাবিত করছে, সেটিও এখানে বিশ্লেষিত হয়েছে।
বিশ্লেষণের কেন্দ্রে রয়েছে আন্ডার-৪০ গ্রাহকগোষ্ঠী। এই প্রজন্ম ভবিষ্যৎ জীবন বীমা শিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার, কারণ তারা বয়সের সঙ্গে সম্পদ তৈরি করবে এবং দীর্ঘ সময় ধরে আর্থিক পণ্য ব্যবহার করবে। একই সঙ্গে তাদের ঝুঁকি-প্রোফাইল তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয়- কম বয়সে কম ক্লেইম হওয়ার প্রবণতা বীমাকারীদের জন্য লাভজনক। কিন্তু এই গ্রাহকগোষ্ঠী এমন একটি বাস্তবতায় বেড়ে উঠেছে যেখানে ডিজিটাল সুবিধা, তাৎক্ষণিক সেবা, স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তিকরণ- এসব আর বিলাসিতা নয়; এগুলোই মৌলিক প্রত্যাশা। তাই তারা এমন বীমা পণ্যকে মূল্যবান মনে করে না, যার ‘মূল্য’ কেবল বহু বছর পরে বা অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর মতো ঘটনার পর উপলব্ধি করা যাবে। তাদের কাছে বীমা অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পাশাপাশি জীবনযাপনের মান উন্নয়ন, স্বাস্থ্য-সচেতনতা এবং দৈনন্দিন সহায়ক সুবিধার অংশ হওয়া উচিত।
এই জায়গাতেই ‘ইন্স্যুরেন্স ফর লিভিং’ ধারণা শিল্পের জন্য একটি নতুন দিগন্ত তৈরি করছে। এতে জীবন বীমা আর শুধু একটি নীতিপত্র বা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নয়; এটি একটি চলমান সেবা- যেখানে গ্রাহক প্রতিদিন বা নিয়মিতভাবে সুবিধা অনুভব করতে পারে। এই পরিবর্তন কেবল পণ্যের ফিচার বাড়ানো নয়; এটি মূলত জীবন বীমার দর্শন বদলে দেয়া। বীমা কোম্পানিগুলোকে এমনভাবে ভাবতে হবে যেন তারা শুধু ঝুঁকি বহন করে না, বরং গ্রাহকের জীবন পরিচালনায় সক্রিয় অংশীদার। এই অংশীদারিত্ব গড়ে উঠলে প্রিমিয়াম দেয়ার বিষয়টি গ্রাহকের কাছে খরচ নয়, বরং মূল্য বিনিময় হিসেবে ধরা দেবে।
আরও বড় বাস্তবতা হলো প্রতিযোগিতার পরিধি বদলে গেছে। জীবন বীমা কোম্পানিগুলো এখন শুধুই নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করছে না। ব্যাংক, ফিনটেক প্রতিষ্ঠান, ওয়েলনেস প্ল্যাটফর্ম এবং ডিজিটাল অর্থনৈতিক সেবা প্রদানকারীরা এমন সব সমাধান দিচ্ছে, যা তরুণদের প্রয়োজনের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তারা স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে আর্থিক পরিকল্পনা- সবকিছুই এক প্ল্যাটফর্মে এনে ব্যবহারকারীদের কাছে তাৎক্ষণিক সুবিধা তৈরি করছে। ফলে জীবন বীমা যদি নিজেকে কেবল ‘মৃত্যু-পরবর্তী সুবিধা’তে সীমাবদ্ধ রাখে, তাহলে বাজারের আস্থা ও মনোযোগ ধীরে ধীরে অন্যদের কাছে চলে যাবে। এই পরিস্থিতিতে জীবন বীমাকে নতুনভাবে প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে- শুধু দাম কমিয়ে নয়, বরং অভিজ্ঞতা উন্নত করে এবং গ্রাহকের জীবনের বর্তমান সমস্যাগুলো সমাধান করে।
এই রূপান্তরের আরেকটি বড় দিক হলো বিতরণ ব্যবস্থার পরিবর্তন। জীবন বীমার ক্ষেত্রে বিক্রয় প্রক্রিয়াটি ঐতিহ্যগতভাবে এজেন্ট-নির্ভর এবং সম্পর্ক-নির্ভর ছিল। কিন্তু তরুণ গ্রাহকরা ডিজিটাল পথে এগোতে চায়- তারা দ্রুত তথ্য চায়, সহজ তুলনা চায় এবং স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত চায়। তবে একই সঙ্গে জীবন বীমার সিদ্ধান্ত বড় ও দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় তারা মানবিক পরামর্শের প্রয়োজনও অনুভব করে। তাই ভবিষ্যৎ বিতরণব্যবস্থাকে এমন হতে হবে, যেখানে ডিজিটাল সুবিধা ও মানবিক দক্ষতা একত্রে কাজ করবে। এই সমন্বয়ই গ্রাহকের বিশ্বাস বাড়াবে, ভুল ধারণা কমাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি এনগেজমেন্ট তৈরি করবে- যা জীবন বীমার প্রকৃত শক্তি।




