আইন অমান্য করে বীমা কোম্পানিগুলো কি অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করবে!

নিজস্ব প্রতিবেদক: ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের জন্য সংশোধিত ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা- ২০১২’ অনুসারে অবশিষ্ট ফি পরিশোধ করতে বীমা কোম্পানিগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। অথচ ২০২৬ সালের নিবন্ধন ফি এরইমধ্যে পরিশোধ করেছে বীমা কোম্পানিগুলো।
অপরদিকে পরিশোধিত ফি নতুন করে বাড়িয়ে তা আদায়ের কোন সুযোগ নেই বীমা আইন-২০১০ এ। এমনকি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইনেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ভুতাপেক্ষা অনুমোদনের ভিত্তিতে অতিরিক্ত ফি আদায়ের কোন এখতিয়ার দেয়া হয়নি।
এমন অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, বীমা আইন লংঘন করে আইডিআরএ’র কর্তাদের স্বেচ্ছাচারি এই সিদ্ধান্ত কতটা মেনে নেবে বীমা কোম্পানিগুলো।
সূত্র মতে, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে গণঅভ্যুত্থানের পর বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ‘দুয়ার সার্ভিস লিমিটেড’’র বিল পরিশোধ করতে অস্বীকার করে বীমা কোম্পানিগুলো। আর এই এসএমএস সার্ভিস বিনামূল্যে প্রদানের নামে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি ৫ গুণ পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় আইডিআরএ।
এমনকি সংশোধিত নিবন্ধন নবায়ন ফি বিধিমালা অনুসারে বাড়তি ফি আদায়ে বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন আটকে রাখে আইডিআরএ।
অথচ বীমা আইন ২০১০ অনুসারে, নিবন্ধন ছাড়া কোনো বীমা কোম্পানির ব্যবসা পরিচালনা অবৈধ। এক্ষেত্রে চলতি বছরের নিবন্ধন নবায়নের জন্য আবেদন করতে হয় আগের বছরের ৩০ নভেম্বরের মধ্যে। নিবন্ধন ফি পরিশোধ করতে হয় সর্বশেষ হিসাব সমাপনী বছরে সংগৃহীত মোট প্রিমিয়ামের ওপর।
গত ৪ ফেব্রুয়ারি ‘বীমা ব্যবসা নিবন্ধন ফি বিধিমালা- ২০১২’ অধিকতর সংশোধন করে গেজেট প্রকাশ করে সরকার। এরপর ১৯ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিগুলোকে এই বাড়তি নিবন্ধন নবায়ন ফি পরিশোধ করতে নির্দেশ দেয় আইডিআরএ। একইসঙ্গে সংস্থাটি থেকে কোম্পানিগুলোকে ফোন করে বাড়তি ফি পরিশোধ না করলে নিবন্ধন নবায়ন না করার হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী- ২০২৬, ২০২৭ ও ২০২৮ সালে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি হবে প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামে ২ টাকা ৫০ পয়সা। ২০২৯, ২০৩০ ও ২০৩১ সালে প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামে ৪ টাকা এবং ২০৩২ সাল ও পরবর্তী সময়ের জন্য হবে প্রতি হাজারে ৫ টাকা।
এর আগে বীমা কোম্পানির নিবন্ধন নবায়ন ফি ছিল প্রতি হাজার টাকা গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ১ টাকা।
এদিকে ২০২৬ সাল থেকে নিবন্ধন নবায়ন ফি বাড়ানোর বিষয়টিকে অযৌক্তিক এবং আইনের সাথে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা। এক্ষেত্রে পূর্বের হারে পরিশোধিত ফি গ্রহণ করে নিবন্ধন নবায়নের দাবি জানিয়েছেন কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীরা। তাদের মতে, ফি বাড়ানো প্রয়োজন হলে সেটা ২০২৭ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র সেক্রেটারি জেনারেল ও সেনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল মো. শফিক শামীম পিএসসি (অব.) বলেন, ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নে বর্ধিত ফি আদায়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা উচিত এবং পূর্বের হারে জমা দেয়া ফি’র ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন সনদ নবায়ন করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বীমা কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন ফি’র নতুন হার ২০২৭ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নিবন্ধন ফি পরিশোধ নিয়ে কোম্পানিগুলোতে যে জটিলতা দেখা দিয়েছে সেটা আর থাকবে না। একইসঙ্গে কোম্পানিগুলো বর্ধিত ফি পরিশোধের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)’র নির্বাহী সদস্য, বিআইএফ’র জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল ও জেনিথ ইসলামী লাইফের মুখ্য নির্বাহী এস এম নুরুজ্জামান বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে যে নিবন্ধন ফি পরিশোধ করা হয়েছে, সেটা ২০২৬ সালে এসে বাড়ানোর বিষয়টি যুক্তিসম্মত মনে হয় না। এক্ষেত্রে আইডিআরএ চাইলে অন্তত ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে এবং পূর্বের হারে পরিশোধিত ফি গ্রহণ করে কোম্পানিগুলোর নিবন্ধন নবায়ন করতে পারে।
আর এটি পুনর্বিবেচনা করা না হলে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের অতিরিক্ত ফি পরিশোধ করা নিয়ে জটিলতায় পড়তে পারে বলে মনে করেন এস এম নুরুজ্জামান।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশন (বিআইএ)’র নির্বাহী সদস্য ও এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী ইমাম শাহীন বলেন, বিধি মোতাবেক আমরা ২০২৬ সালের নিবন্ধন নবায়নের জন্য পূর্বের হারে ২০২৫ সালের নভেম্বরে ফি পরিশোধ করেছি। এরইমধ্যে নিবন্ধন নবায়নের সময়ও শেষ হয়েছে।
এক্ষেত্রে আইন অনুসারে সময় শেষ হওয়ার পর বিধিমালা সংশোধন করে পুনরায় ফি চার্জ করতে পারেন না কর্তৃপক্ষ। তবে বিষয়টিকে কিভাবে সমাধান করা হবে সেটি কোম্পানিগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেবে বিআইএ।
তিনি বলেন, সংশোধিত বিধিমালা অনুসারে ২০২৫ সালে পরিশোধিত ফি প্রতি হাজার গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে আড়াই টাকা করা হয়েছে, যেখানে অতিরিক্ত দেড় টাকা পরিশোধ করতে হবে। এই বাড়তি ফি বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে এবং এর ফলে কোম্পানিগুলোর খরচের হার বেড়ে যাবে বলে মনে করেন ইমাম শাহীন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকটি লাইফ বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ২০২৫ সালের নভেম্বরে আমরা নিবন্ধন নবায়ন ফি পরিশোধ করেছি। আর এই খরচ নির্ধারিত হয়েছে ২০২৪ সালের গ্রস প্রিমিয়ামের ওপর ভিত্তি করে, যা ২০২৫ সালের খরচ হিসাবে দেখানো হয়েছে। এক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ফেব্রয়ারিতে এসে আমরা এখন কিভাবে ২০২৫ সালের খরচ করব!
তিনি বলেন, আইডিআরএ’র এমন সিদ্ধান্তের কোন যৌক্তিকতা আমরা দেখছি না। তবে ফি বাড়ানো প্রয়োজন হলে সেটা ২০২৭ সাল থেকে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে, যা ২০২৬ সালের খরচ হিসেবে দেখানো যাবে। এক্ষেত্রে আমরা আগে থেকেই সেভাবে খরচ নির্ধারণ করে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারব।



