কার্গো চুরি বাড়ায় কঠোর হচ্ছে বীমা আন্ডাররাইটিং নীতিমালা

সংবাদ ডেস্ক: সংগঠিত অপরাধচক্রের কৌশলী কার্গো চুরি বা স্ট্র্যাটেজিক কার্গো থেফট দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বৈশ্বিক লজিস্টিকস বীমা খাত নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। প্রচলিত ভাঙচুর বা জোরপূর্বক চুরির পরিবর্তে এখন অপরাধীরা প্রতারণা, পরিচয় জালিয়াতি এবং ডিজিটাল কৌশল ব্যবহার করে উচ্চমূল্যের পণ্য সরিয়ে নিচ্ছে। এর ফলে বীমা দাবি বেড়ে যাচ্ছে এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন জটিল হয়ে পড়ায় বীমা কোম্পানিগুলো তাদের আন্ডাররাইটিং নীতিমালা আরও কঠোর করছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই নতুন ধরনের কার্গো চুরিতে অপরাধীরা সরাসরি আক্রমণের বদলে সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রশাসনিক ও ডিজিটাল দুর্বলতাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। অনেক ক্ষেত্রে তারা বৈধ ক্যারিয়ার বা ব্রোকারের পরিচয় চুরি করে নিজেদের অনুমোদিত পক্ষ হিসেবে পরিচয় দেয়। এরপর ডাবল-ব্রোকেরিং কৌশলের মাধ্যমে পণ্য পরিবহনের দায়িত্ব নেয় বা কনসাইনি সেজে সরাসরি কার্গো গ্রহণ করে।

এই ধরনের লেনদেন সাধারণ ব্যবসায়িক হস্তান্তরের মতোই দেখায়, ফলে অনেক ক্ষেত্রে পণ্য নিখোঁজ হওয়ার পরেই চুরির ঘটনা শনাক্ত করা যায়।

শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, সমস্যার মাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ঝুঁকি বিশ্লেষণ সংস্থা ভেরিস্ক কার্গোনেট জানিয়েছে, ২০২৫ সালে কার্গো চুরিজনিত মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭২৫ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় ৬০ শতাংশ বেশি।

যদিও উত্তর আমেরিকায় চুরির ঘটনার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, তবু প্রতিটি ঘটনার আর্থিক ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৫ সালে প্রতি ঘটনার গড় ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৭৪ হাজার ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ বেশি।

বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীরা এখন উচ্চমূল্যের পণ্যের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক্স, স্টোরেজ ড্রাইভ, কম্পিউটিং যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য প্রিমিয়াম প্রযুক্তিপণ্য।

সরবরাহ শৃঙ্খল নিরাপত্তা বিশ্লেষণেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতারণা, সাইবার কৌশল এবং পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে সংঘটিত স্ট্র্যাটেজিক কার্গো চুরি ২০২১ সালের পর থেকে ১,৫০০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে মোট কার্গো চুরির ঘটনায় এই ধরনের অপরাধের অংশ দ্রুত বাড়ছে।

এই পরিস্থিতি লজিস্টিকস বীমা আন্ডাররাইটিংয়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বীমা কোম্পানিগুলোকে এখন ক্রমবর্ধমান দাবি এবং আরও জটিল প্রতারণামূলক স্কিম মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় অনেক বীমা প্রতিষ্ঠান উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের ক্ষেত্রে ডিডাক্টিবল বাড়ানো, প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, কভারেজে সাব-লিমিট আরোপ এবং পলিসিধারীদের কাছ থেকে আরও শক্তিশালী ক্ষতি প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছে।

ফলে কিছু ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের জন্য বীমা কভারেজ পাওয়া আগের তুলনায় কঠিন হয়ে উঠছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় লজিস্টিকস কোম্পানিগুলো এখন ক্যারিয়ার ও ব্রোকার যাচাই প্রক্রিয়া শক্তিশালী করা, উন্নত ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শিল্পখাতভিত্তিক তথ্য বিনিময় উদ্যোগ জোরদারের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে।

খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৬ সালেও এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। সংগঠিত অপরাধচক্রগুলো বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের ডিজিটাল দুর্বলতা কাজে লাগিয়ে কার্গো চুরি চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে।

এই প্রেক্ষাপটে বীমা কোম্পানি, ব্রোকার এবং লজিস্টিকস সেবা প্রদানকারীদের মধ্যে সহযোগিতা, তথ্য বিনিময় এবং শক্তিশালী ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব বাড়ছে। এর মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান কার্গো চুরির আর্থিক ও কার্যগত প্রভাব কমিয়ে আনার প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে।