বিশ্বব্যাপী বীমা জালিয়াতি: অঞ্চলভেদে ভিন্ন চ্যালেঞ্জ, বাড়ছে প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা
.jpg)
সংবাদ ডেস্ক: বিশ্বজুড়ে বীমা খাতে জালিয়াতির ধরন অঞ্চলভেদে ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট- প্রতারণা দিন দিন আরও বুদ্ধিদীপ্ত, দ্রুত এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিস্তৃত হয়ে উঠছে। বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো বিষয়গুলো এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক ক্ষেত্রে দাবিদাররা বিদেশি নথি বা তথ্য ব্যবহার করে বীমা দাবি সমর্থন করেন, যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকার কিছু দেশে হাসপাতালের নথি যাচাই করতে সরাসরি সেখানে গিয়ে দেখতে হয়, কারণ সেখানে ডিজিটাল বা কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডারের অভাব রয়েছে। ফলে দূরবর্তী বা দুর্গম দেশে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে সময় ও ব্যয় উভয়ই বেড়ে যায়। এই সুযোগকেই কাজে লাগিয়ে প্রতারকরা বীমা দাবি প্রক্রিয়াকে অপব্যবহার করে।
বিশ্বব্যাপী বীমা জালিয়াতির সাধারণ কৌশলগুলোর মধ্যে রয়েছে মিথ্যা মৃত্যু বা অসুস্থতার নাটক সাজানো, অতিরঞ্জিত ক্ষতির দাবি, জাল নথিপত্র তৈরি এবং জীবনবীমা নীতির সঙ্গে যুক্ত স্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতারণা। তবে এসব প্রতারণার ধরন প্রতিটি অঞ্চলের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং নিয়ন্ত্রক বাস্তবতার ওপর নির্ভর করে ভিন্নভাবে প্রকাশ পায়।
এদিকে পরিবেশগত পরিবর্তন এবং বড় আকারের প্রাকৃতিক দুর্যোগও বীমা খাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ব্যারেট বলেন, ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন এবং চরম আবহাওয়ার কারণে অনেক বীমা কোম্পানি কিছু বাজারে পুনর্বীমা (রিইন্স্যুরেন্স) নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করছে। এসব অঞ্চলে ঝুঁকি নিরূপণ এবং সম্ভাব্য জালিয়াতি শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে বীমা ব্যবসা পরিচালনা কম লাভজনক হয়ে উঠছে।
অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে, বিশেষ করে ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ এলাকায়, বীমা কোম্পানিগুলো বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘনত্ব ও তীব্রতা বাড়ার ফলে দাবি (ক্লেইম) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রিমিয়াম বাড়াতে বাধ্য হয়েছে বা কিছু এলাকায় কভারেজ সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করেছে। উদাহরণ হিসেবে উত্তর কুইন্সল্যান্ডের কথা উল্লেখ করা যায়, যেখানে কিছু বীমা কোম্পানি বাজার থেকে সরে যাওয়ার পর নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
বীমা সুরক্ষার অভাবে অনেক মানুষ আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে অসাধু পন্থা অবলম্বনের চেষ্টা করেন। কেউ কেউ এমন ক্ষতির দাবি করেন যা বাস্তবে ঘটেনি, আবার কেউ প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ অতিরঞ্জিত করে দেখান। কিছু ক্ষেত্রে সংগঠিত প্রতারণা চক্র পরিকল্পিতভাবে ক্ষতির নাটক সাজিয়ে বীমা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে।
মেক্সিকোতেও বীমা খাতে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটিতে অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে বীমা জালিয়াতির প্রতি সামাজিক সহনশীলতা তুলনামূলক বেশি। দুর্বল আইন প্রয়োগ এবং বিচারিক ব্যবস্থার অসঙ্গতির কারণে অনেক প্রতারক তেমন শাস্তি পায় না, ফলে প্রতারণার সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হয়। পাশাপাশি উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি ও বেকারত্ব অনেক মানুষকে দাবি অতিরঞ্জন বা সাজানো দুর্ঘটনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
মেক্সিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্স্যুরেন্স ইনস্টিটিউশনস (এএমআইএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে বীমা জালিয়াতির অন্তত ৩০ শতাংশই সাজানো সড়ক দুর্ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত। স্প্যানিশ ভাষায় যাকে ‘মন্টাচোকেস’ বলা হয়। এসব ক্ষেত্রে প্রতারকরা হঠাৎ ব্রেক করা, হঠাৎ লেন পরিবর্তন করা কিংবা মোটরসাইকেল আরোহী বা পথচারীর সঙ্গে যোগসাজশ করে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটিয়ে নগদ অর্থ দাবি করে।
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিশেষ করে ব্যস্ত সড়কগুলোতে এ ধরনের অপরাধের ঘটনা প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছে। মেক্সিকো সিটি, স্টেট অব মেক্সিকো, জালিস্কো এবং নুয়েভো লিয়ন অঞ্চলে এসব ঘটনার হার তুলনামূলক বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বীমা জালিয়াতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থাও আধুনিক করা জরুরি। এজন্য বীমা কোম্পানিগুলোকে কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাড়াতে হবে, যাতে তারা সন্দেহজনক আচরণ এবং নথির অসঙ্গতি দ্রুত শনাক্ত করতে পারেন।
এছাড়া রিয়েল-টাইম ডাটা বিশ্লেষণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং প্রেডিকটিভ মডেলিংয়ের মতো প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে তৃতীয় পক্ষের তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ।
আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থা পিংকার্টন বিভিন্ন দেশে মাঠপর্যায়ে তদন্ত পরিচালনার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলোকে ঘটনার প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ে সহায়তা করছে। এর ফলে জাল নথিপত্র এবং প্রতারণামূলক দাবির ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক সহযোগিতা, উন্নত প্রযুক্তি এবং শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই ক্রমবর্ধমান বীমা জালিয়াতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ সম্ভব হবে।




