সিইও পদে নিয়োগ পেতে মিথ্যা তথ্য দিয়েছে বশির আহমেদ: সতর্ক করার সুপারিশ তদন্ত কমিটির, আইনে শাস্তি ৩ বছর কারাদণ্ড

নিজস্ব প্রতিবেদক: বীমা আইনে মিথ্যা তথ্য প্রদানের শাস্তি উল্লেখ করা হয়েছে- অনধিক ৩ বছর কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। অথচ জনতা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহীর অনুমোদন পেতে বশির আহমেদের দেয়া মিথ্যা তথ্যের শাস্তি হিসেবে তাকে সতর্ক করার সুপারিশ করেছে আইডিআরএ’র তদন্ত কমিটি।

এ ছাড়াও কৌশলের আশ্রয় নিয়ে মিথ্যা তথ্যকে অসত্য তথ্য বলে উপস্থাপন করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে। বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র কাছে গত ৮ সেপ্টেম্বর এই প্রতিবেদন দাখিল করেছে কর্তৃপক্ষের ৩ সদস্যের তদন্ত দল।

তদন্ত কমিটিতে দলনেতা ছিলেন বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক (আইন) এস এম শাকিল আখতার। এ ছাড়াও কমিটির সদস্য ছিলেন কর্তৃপক্ষের পরিচালক (নন-লাইফ) মো. জাহাঙ্গীর আলাম এবং অফিসার (নন-লাইফ) সৈয়দ শরীফুল হক।

জনতা ইন্স্যুরেন্সের মূখ্য নির্বাহী পদে নিয়োগ অনুমোদন পেতে বশির আহমেদের জীবন বৃত্তান্ত এবং অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগের সত্যতা খুঁজতে গত ৫ আগস্ট এ তদন্ত কমিটি গঠন করে আইডিআরএ।

সরেজমিন তদন্তে অভিযোগের সত্যতা খুঁজে পেয়েছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে কমিটি। আইডিআরএ অভিযোগটি করেন বীমা কোম্পানিটির শেয়ারহোল্ডারবৃন্দ। তবে অভিযোগপত্রে কারো নাম না থাকলেও প্রমাণ হিসেবে নথিপত্র দেয়া হয়।

এ বিষয়ে গত ১২ আগস্ট ‘আমার ভাই পুলিশ কমিশনার’ বলে হুমকি দিলেন জনতা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী প্রার্থী- শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ করে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি।

শেয়ারহোল্ডারদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত ১৭ আগস্ট জনতা ইন্স্যুরেন্সে সরেজমিন তদন্ত করে আইডিআরএ’র তদন্ত দল জানিয়েছে-

মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা, ২০১২ এর ৩(খ) অনুযায়ী মুখ্য নির্বাহীর অব্যবহিত নিম্ন পদে ৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নেই জনতা ইন্স্যুরেন্সের প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বশির আহমেদের।

এ পদে তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে ১ বছর ৩ দিনের।

আবার ওই প্রবিধানমালা অনুসারে অনুরুপ শ্রেণির বীমা ব্যবসায় বশির আহমেদের ১৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা নেই বলে জানিয়েছে তদন্ত দল।

এক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা ১৩ বছর ৩ মাস ২৩ দিন বলে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।

প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বশির আহমেদের জীবন বৃত্তান্তে উল্লেখিত বিভিন্ন পদে কর্ম অভিজ্ঞতার বিভিন্ন প্রমাণক দলিলাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তদন্ত দল জানিয়েছে-

জুনিয়র মার্কেটিং অফিসার এবং অফিসার গ্রেড-২ (এ) হিসেবে জনতা ইন্স্যুরেন্সে ৭ বছর ৫ মাস ২৪ দিন কাজের তথ্য দিয়েছেন বশির আহমেদ। তবে জুনিয়র মার্কেটিং অফিসার থেকে অফিসার গ্রেড-২ (এ) হিসেবে কোন তারিখে পদোন্নতি পেয়েছেন তার কোন প্রমাণক দলিল তিনি প্রদশন করতে সক্ষম হননি।

জনতা ইন্স্যুরেন্সের ২০১৮ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে আইডিআরএ’র তদন্ত দল জানিয়েছে- বশির আহমেদ জনতা ইন্স্যুরেন্সের কোম্পানি সেক্রেটারি ছিলেন, যা বীমা কোম্পানিটির পদের ক্রমানুসারে তৃতীয় পদ।

অর্থাৎ অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে বশির আহমেদ মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন বলে যে অভিযোগ করা হয়েছে তার সত্যতা পেয়েছে তদন্ত দল।

তদন্ত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে- জনতা ইন্স্যুরেন্সের প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বশির আহমেদ বীমা আইন ২০১০ এর ৮০ ধারা অনুযায়ী অবৈধভাবে কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার চলতি দায়িত পালন করছেন।

এ ছাড়াও চেকের মাধ্যমে নগদে টাকা উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়েও সত্যতা খুঁজে পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওই তদন্ত কমিটি।

বশির আহমেদের বিরুদ্ধে ভুয়া ও মিথ্যা তথ্য দেয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে ৬টি সুপারিশ করেছে কর্তৃপক্ষের তদন্ত কমিটি। সেগুলো হলো-

>মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে অব্যবহিত নিন্মপদে ৩ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা এবং অনুরূপ শ্রেণির বীমা ব্যবসায় ১৫ বছরের কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় বশির আহমেদের নিয়োগ অনুমোদন করার সুযোগ নেই মর্মে প্রতীয়মান হয়।

>অভিজ্ঞতা সংক্রান্ত প্রত্যয়নপত্রে সঠিক তথ্য না থাকায়, ভবিষ্যতে এ জাতীয় অসত্য তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে সতর্ক করা যেতে পারে।

>প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার জীবন বৃত্তান্তে অসত্য তথ্য প্রদান করায় তাকে সর্তক করা যেতে পারে।

>জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রে বীমা আইন ২০১০ এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা, ২০১২ যথাযথভাবে অনুসরণ করার জন্য অনুরোধ হলো। ভবিষ্যতে এ জাতীয় কাজের পুণরাবৃত্তি ঘটলে বীমা আইন ২০১০ অনুযায়ী কর্তৃপক্ষ কর্তৃক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

>ইউনাইটেড কর্মাশিয়াল ব্যাংক লিমিটেডের প্রিসিপাল শাখায় জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির ১ জানুয়ারি ২০২১ থেকে

২১ আগস্ট ২০২১ তারিখ পর্যন্ত নগদ টাকা উত্তোলনের বিযয়ে কোম্পানির নিকট ব্যাখ্যা চাওয়া যেতে পারে।

>বীমা আইন ২০১০ এবং মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ ও অপসারণ প্রবিধানমালা, ২০১২ অনুসরণ করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রস্তাবিত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. বশির আহমেদকে অপসারণ পূর্বক জনতা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে একজন দক্ষ ও যোগ্য মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা জরুরি ভিত্তিতে নিয়োগ করা যেতে পারে।

এ বিষয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক এবং এ সংক্রান্ত তদন্ত কমিটির আহবায়ক এস এম শাকিল আখতারের সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।

তবে শেয়ারহোল্ডারদের এসব অভিযোগ সরেজমিন তদন্ত করে আইডিআরএ তদন্ত কমিটির দেয়া প্রতিবেদনের বিষয়ে জনতা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) মো. বশির আহমেদ ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে বলেন, ওগুলোর সবই তারা সঠিক পাইছে এটাই আমাদেরকে জানাইছে এবং পরবর্তী যা করার তারা করবে।

উল্লেখ্য, বীমা আইন ২০১০ এর ১৩১ ধারায় দলিল, বিবরণী, হিসাব, রিটার্ন ইত্যাদিতে মিথ্যা তথ্য প্রদানের শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে- “যদি কোন ব্যক্তি এইরূপ বক্তব্য প্রদান করেন বা এমন কোন দলিল, বিবরণী, হিসাব, রিটার্ন বা প্রতিবেদন দাখিল করেন যাহা মিথ্যা এবং মিথ্যা বলিয়া তিনি মনে করেন বা বিশ্বাস করেন বা সত্য বলিয়া মনে করেন না, তবে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদন্ডে দন্ডিত হইবেন অথবা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হইবেন।”