করোনা- বাঁচার উপায় সচেতনতা আর সচেতনতা
মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ: আমরা বীমা কর্মীরা প্রতিনিয়ত মাঠে ময়দানে কাজ করে থাকি। গ্রাহক সেবাই আমাদের পরম ধর্ম। সরকার যখন পুরোদেশ লকডাউন করেছেন জনগণের নিরাপত্তার জন্য আমাদের ক্ষেত্র বিশেষে গ্রাহকদের সেবা দেবার জন্য বের হতে হচ্ছে।
আমি নন-লাইফের কর্মী হিসেবে বলতে চাই ব্যাংক সীমিত আকারে খোলা রয়েছে। এখনো বিশেষ বিশেষ প্রয়োজনে যা জনকল্যাণকর যেমন ওষুধ, পিপিই, সেনিটাইজেশন, খাদ্য ইত্যাদি খাতে এল.সি খোলা হচ্ছে। অন্য দিকে পূর্বে ইস্যুকৃত মেরিন কভারনোটের মালামাল পোর্টে আসার পর তা খালাস করার জন্য বীমা পলিসি জরুরি (সরকারী নির্দেশনা অনুযায়ী) তাই প্রায়শ: আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজে যেতে হচ্ছে।
তাই জনগণ, দেশ বিদেশের তথা বিশ্বের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে এবং সকল বীমা কর্মীদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করতে আমার আজকের লেখা।
আজ পৃথিবীর সকল প্রান্ত একটি মাত্র ভাইরাসে আতঙ্কিত। প্রচণ্ড প্রভাবশালী দেশ কিংবা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী- কেউই এর থাবার বাইরে নয়। যে দেশ একে অবহেলা করেছে তারাই বেশ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সে হিসেবে আমেরিকা এবং ইতালির অবস্থা ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করেছে । তাদের আর্থিক এবং প্রযুক্তির উন্নয়নও কাজে আসছে না। তাছাড়া ফ্রান্স, স্পেন, যুক্তরাজ্য, ইরান, সৌদি আরবের মতো দেশগুলোতেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়ে চলেছে। ইসরাইল এবং যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীকেও করোনা কোনো করুণা করছে না । দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটাই সবচেয়ে বড় যুদ্ধ- যা পৃথিবীর অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে নিমিষেই থামিয়ে দিয়েছে, এবং এর ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, তাই আমাদের উচিত সরকারের হাতকে শক্তিশালী করা। বিত্তবানদের জন্যেও- এ এক অনন্য সুযোগ সকল শ্রেণীর মানুষের মাঝে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়ার। নিজেদের এলাকা কিংবা সরকারের নির্ধারিত এলাকা, যেখানে গরিব অসহায় দুস্থ ব্যক্তিরা রয়েছে তাদেরকে যেভাবে সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করে যেতে হবে। সেখানে সত্যিকারের দুস্থ লোকেরাই যাতে সাহায্য পায় এবং শুধুমাত্র অসহায় সম্বলহীনদের চিহ্নিত করে দান করতে হবে। তাছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মীরা যাতে দুস্থদের তালিকায় ঢুকতে না পারে তা কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে ।
আমাদের দেশে যে পরিমাণ ধনবান ব্যক্তি রয়েছেন, আমরা কিন্তু সে পরিমাণ সাড়া পাচ্ছি না । বিক্ষিপ্ত গুটি কয়েক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান যার যার দিক থেকে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছেন, তরুণ সমাজও বসে নেই। তারা সচেতনতা সহ সকল ধরনের কর্মকাণ্ড নিভৃতে করে যাচ্ছে। কোনো বাঁধাই তারা মানছে না- তাদের কাছে নিজের চেয়ে দুস্থ মানবতার সেবাই পরম ধর্ম। ভারতের ধনকুবের আজিম প্রেমজি সে দেশের জন্য ৫০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অনুদান করার ঘোষণা দিয়েছেন- এছাড়াও রতন টাটাও ঘোষণা দিয়েছেন দেশ সংকটে পড়লে তিনি তার সমস্ত সম্পত্তি সরকারকে দিয়ে দিবেন । তারা আমাদের জন্য উদাহরণ হতে পারেন। এমনভাবে অকৃত্রিমভাবে দান করার মতো লোকের সংখ্যা আমাদের দেশেও কম নেই, কিন্তু মানবিকতা সম্পন্ন লোকের সংখ্যা কত তা আজও অনুমান করা যায়নি। বিত্ত-বৈভব নিয়ে নিয়ে কেউই পৃথিবী ত্যাগ করতে পারবে না, তাই নিজের জীবিত অবস্থায় অসহায় মানুষের মাঝে নিজের আহরিত সম্পদ থেকে কিছুটা নিজ হাতে বিলিয়ে আত্মতৃপ্তি নিয়ে মরলে শান্তিতে মরা যায়, সম্পদ রেখে যাওয়ার বিড়ম্বনা থেকেও বাঁচা যায়। আমাদের এখন দরকার দানবীর মহসীনের মতো অসংখ্য দানকারী ব্যক্তি, যারা এই দুর্যোগপূর্ণ মুহূর্তে সরকারের পাশে দাঁড়াবে ।
প্রযুক্তির উন্নয়নের কারণে সকলের হাতেই মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার এখন ডাল-ভাত। ইন্টারনেটেই দুনিয়ার সকল দেশের খবর মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে, এর মধ্যে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা তা বুঝার কোনো উপায় নেই, তবে এই খবরগুলো যে মানুষের কল্যাণে কোনো কাজে আসছে না তা কিন্তু নয়! যেমন লক্ষ্য করুন:
১) ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নিবেন ।
২) পর্যাপ্ত পানি পান করুন ।
৩) বাড়িতে থাকুন, নিজে সংক্রমণ থেকে বাঁচুন এবং প্রিয়জনদের বাঁচতে দিন ।
৪) হাঁচি, কাঁশি দেবার সময় টিস্যু বা হাত দিয়ে নাক ঢাকুন, এক টিস্যু দুবার ব্যবহার করবেন না ।
৫) চোখে, নাকে ও মুখে হাত দিবেন না ।
৬) কারো সাথে হাত মিলাবেন না ।
৭) সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন ।
৮) জনসমাবেশে যাবেন না ।
৯) অতি প্রয়োজন না হলে বাড়ির বাইরে যাবেন না ।
১০) কোনো আত্মীয়-স্বজনকে বাসায় ডাকবেন না এবং আপনি কারো বাসায় যাবেন না ।
১১) বাহিরে ব্যবহৃত জুতা নিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করবেন না ।
১২) ভিটামিন সি যুক্ত খাবার (কমলা, মালটা, পেয়ারা) ইত্যাদি বেশি করে খাবেন ।
শুধু তা-ই নয়, করোনা ভাইরাস কোনো বস্তুতে কতক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে তাও আধুনিক ইন্টারনেট আমাদের জানতে শিখিয়েছে :
১) সার্জিক্যাল গ্লাভস এ ৮ ঘণ্টা
২) অ্যালুমিনিয়াম এ ২-৮ ঘণ্টা
৩) কাঁচ জাতীয় বস্তুতে ৪ দিন
৪) কাঠ বা কাঠের আসবাবপত্রে ৪ দিন
৫) পেপার বা কাগজে ৪-৫ দিন
৬) প্লাস্টিকের তৈরী জিনিসপত্রে ৫ দিন
৭) স্টিল বা স্টিলের তৈরী জিনিস পত্রে ৪৮ ঘণ্টা
করোনা ভাইরাস সম্পর্কে ইতালির এক ডাক্তার নিভৃতে কাঁদছিলেন আর বলছিলেন- "করোনা রোগীর যন্ত্রণা কেউ চোখে দেখলে ভয়ে জানালা খুলতেও সাহস পাবে না"। আর একজন বাংলাদেশী ডাক্তার তার ভিডিওতে বলেছিলেন কিভাবে একজনের মুখ থেকে করোনা ভাইরাস অন্যের মুখের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে ।
আমাদের সকলের কাছেই খুব পরিচিত বিশ্বখ্যাত ধনী বিল গেটস বলেছেন- "করোনা ভাইরাস কতটা শক্তিশালী তা টম হ্যাঙ্কস বা প্রিন্স চার্লসকে দেখে বুঝা যায়"। সীমান্ত পাড়ি দিতে ভাইরাসের ভিসা, পাসপোর্টের কোনো প্রয়োজন পড়েনি এবং আমরা এই কিছুদিন হোম কোয়ারান্টিনে থেকে অসুস্থ, অসহায় মানুষদের কষ্ট কিছুটা অনুভব করতে পারছি, নিজেদের স্বাস্থ্যের মূল্য সম্পর্কে নতুনভাবে ধারণা পাচ্ছি। করোনা ভাইরাস আমাদের আরও বুঝিয়েছে যে আমাদের জীবন কতটা সংক্ষিপ্ত। এমন সংকটময় মুহূর্তেই কেবল পানি, খাদ্য, ওষুধের মতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো আমরা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করি। করোনা ভাইরাস আমাদের নতুন করে পরিবার- পরিজন এবং প্রতিবেশীদের নতুনভাবে চেনার, পাশে থাকার, রক্ষা করার এবং সাহায্য করার সুযোগ করে দিয়েছে। খ্যাতির দম্ভ, ক্ষমতার দম্ভ বা বিত্তের দম্ভ- এ সবই নিমিষেই চুপসে যেতে পারে। আমাদের সকলেরই ইচ্ছাশক্তির পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে- ভালো হব না মন্দ হব, স্বার্থপর হব না পরার্থপর হব, ভালোবাসবো না ঘৃণা করবো- এ সবকিছুর পূর্ণ স্বাধীনতা সবারই আছে এবং এমন সংকট আমাদের সবার স্বরূপ বের করে দেয়। এমন সংকটে আমরা অতীতেও সম্মুখীন হয়েছি তাই মনে রাখতে হবে পৃথিবীর কোনো সংকটই দীর্ঘস্থায়ী নয়। প্রতিটি সংকটের পর সুসময় আসবেই, কাজেই অতিরিক্ত আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে আমরা যেন নিজেদের আরও বেশি ক্ষতি করে না ফেলি। আমাদের বিত্তবানরা যদি বিল গেটস, আজিম প্রেমজি বা রতন টাটার মতো মুক্ত হস্তে সরকারকে সহযোগিতা করেন, তাহলে ক্ষুধা মুক্ত, করোনা মুক্ত একটি বাংলাদেশ সময়ের ব্যাপার মাত্র। বসুন্ধরা ও আকিজ গ্রূপের মতো অনেকেই হাসপাতাল, পিপিই ইত্যাদি উৎপাদনে মনোযোগী হয়েছেন তা সত্যি আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে।
করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার জন্য ফেইসবুকের মাধ্যমে অনেকে অনেক উপদেশ দিয়ে যাচ্ছেন কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রধান উপদেশ হলো "পরীক্ষা, পরীক্ষা আর পরীক্ষা" -যদি আমরা কিটের স্বল্পতা কাটিয়ে উঠে পরীক্ষার মাধ্যমে রোগীদের নির্ণয় করতে পারি ও তাদের যথাযথ ট্রিটমেন্ট দিতে পারি তবেই এই ভাইরাস থেকে দ্রুত জাতিকে মুক্তি দিতে পারবো। তবুও আমরা সংক্রমণ এড়াতে হাঁচি, কাঁশি দিতে টিস্যু ব্যবহার করি কারণ এটা সহজলভ্য, যেখানে সেখানে থুথু, কফ, মলমূত্র ফেলা বন্ধ করতে হবে, প্রচুর গরম পানি, প্রয়োজনে চা, ভিটামিন সি জাতীয় ফলমূল ও শাকসবজি খেতে হবে, পরিবারের সাথে সময় কাটাতে হবে, ঘন ঘন হাত ধুতে হবে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিধি মেনে চলতে হবে এবং জ্বর, কাঁশি, শ্বাসকষ্ট জাতীয় লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে ।
প্রাণঘাতী করোনা আমাদের জীবনযাত্রার ধরণ পাল্টে দিয়েছে। আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্য, পারিবারিক এবং সামাজিক জীবনকে এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করে তুলেছে। প্রতিদিনই আমরা নতুন সব পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, তাই জীবনের যেসব ক্ষেত্রে করোনা ভাইরাস স্পর্শ করেছে সে সম্পর্কে জাতিকে সঠিক তথ্য দিয়ে এই ভাইরাস এর সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায় দেখাতে হবে নতুবা আমাদের অশিক্ষিত জাতি গৃহবন্দী অবস্থা থেকে বের হয়ে সারা দেশে সংক্রমিত করলে এ দেশে মহামারির পর্যায়ে উন্নীত করবে। অতি সত্বর গ্রাম থেকে ফেরত যাত্রীদের যথাযথ স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর বাস, রেল, লঞ্চ ফেরি ইত্যাদিতে উঠার ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক নির্দেশিত করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তির সকল শর্তাবলী সুনাগরিকের মতো অবশ্যই মেনে চলতে হবে।
এই দুর্যোগে গভীরভাবে অনুভব করছি ঐক্য, মৈত্রী ও সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা, যার মধ্য দিয়ে মানুষ বর্তমান সংকটকে পরাস্ত করবে ইনশাআল্লাহ। আসুন আমরা নিজেদের শুধরানোর চেষ্টা করি, করোনা পরিস্থিতি থেকে শিক্ষা নিতে পারি যে, এটা পৃথিবীর শেষ নয় বরং এক নতুন পৃথিবী গড়ার সূচনা। আসুন আমরা সকলেই নিজেদের জীবনের স্বার্থে সচেতন হই।
লেখক : মীর নাজিম উদ্দিন আহমেদ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্সুরেন্স কোম্পানি।