জীবন বীমায় মাঠ পর্যায়ের এজেন্ট অসন্তোষ এবং আমাদের করণীয়

শিপন ভূঁইয়া: বীমা মানেই প্রতারণা -এমন কথা মাঠ পর্যায়ে প্রায় শোনা যায়। কত লাইফ প‌লি‌সির নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হ‌য়ে‌ছে কিন্তু বছরের পর বছর ঘুরেও নি‌জের ক‌ষ্টের অর্জিত টাকা পা‌চ্ছে না বীমা গ্রাহক। কথাগু‌লো অপ্রিয় সত‌্য। মাঠ পর্যা‌য়ের বীমা এজেন্টদের প্রতি‌নিয়ত এমন কথা শুন‌তে হয়। গ্রাহকরা বীমা দা‌বির টাকা পে‌তে এজেন্ট‌দের বি‌ভিন্নভা‌বে চাপ দি‌চ্ছে এবং এজেন্টগণ সামা‌জিকভা‌বে হে‌নস্থার শিকার হ‌চ্ছে। এমন‌কি বাধ‌্য হ‌য়ে অনেক এজেন্ট বা‌ড়ি-ঘরও ছে‌ড়ে‌ছে। এজেন্টরা বীমা শি‌ল্পের ব‌্যবসা‌য়ের প্রাণ। বীমা এজে‌ন্টদের য‌দি মাঠ পর্যা‌য়ে এমন অবস্থা চল‌তে থা‌কে তা হ‌লে বীমা শিল্প চরম ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

বীমা মানু‌ষের আর্থিক ঝুঁকি নিরস‌নে কাজ ক‌রে। এক‌টি দে‌শের উন্নয়‌নে বীমার গুরুত্ব অনেক। বীমা খাত জাতীয় সঞ্চয় ও উন্নয়‌ন বি‌নি‌য়ো‌গে কার্যকরভা‌বে অবদান রা‌খে। উন্নত বি‌শ্বে পুঁ‌জিঁবাজা‌রে এবং বন্ড মার্কেটে বি‌নি‌য়োগে বীমা খাতের ব‌্যাপক ভূ‌মিকা র‌য়ে‌ছে। বাংলা‌দে‌শে বীমা‌কে জন‌প্রিয় কর‌তে হ‌বে কারণ কল‌্যাণ ফান্ড বা ভর্তু‌কির চে‌য়ে অধিক সংখ‌্যায় জনসাধারণ‌কে নিরাপত্তার আওতায় আনা সম্ভব। বাংলা‌দে‌শের সম্পদ ব‌্যবস্থাপনায় এ খা‌তের তেমন কোন অবদান দৃশ‌্যমান নয়। মাত্র দু`কো‌টি জনগণ‌কে লাইফ বীমার আওতায় আনা সম্ভব হ‌য়ে‌ছে।

বাংলা‌দে‌শের বীমা শি‌ল্পের প্রতি জনগ‌নের আস্থার সংকট বর্তমা‌নে প্রকট আকার ধারণ ক‌র‌ছে। গ্রাহ‌কের হয়রা‌নি দিন দিন বৃ‌দ্ধি পা‌চ্ছে। ফলশ্রু‌তি‌তে বীমা ব‌্যবসা দিন দিন হ্রাস পা‌চ্ছে। বাংলা‌দে‌শের উন্নয়‌নের পেক্ষাপ‌টে জি‌ডি‌পি‌তে বীমার পে‌নি‌ট্রেশন খুবই নাজুক। অন‌্যদি‌কে বীমা এজেন্টগণ মাঠ পর্যা‌য়ে হেনস্থার শিকার হ‌য়ে কা‌জের প্রতি উৎসাহ হারা‌চ্ছে। দিন দিন এজেন্ট বৃ‌দ্ধির প‌রিব‌র্তে এজেন্ট হ্রাস পা‌চ্ছে।

বীমা আইন ২০১০ মতে, বীমা মেয়‌াদ শেষ হবার পর প্রয়োজ‌নীয় দ‌লিলা‌দি জমা দেয়ার ৯০ দি‌নের ম‌ধ্যে বীমা দা‌বি নিষ্প‌ত্তি কর‌তে হ‌বে। অন‌্যথায় নির্দিষ্ট হা‌রে জ‌রিমানাসহ গ্রাহককে টাকা দি‌তে হ‌বে। দে‌শে এমন আইন থাক‌লেও অনেক কোম্পা‌নি আইনের তোয়াক্বা না ক‌রে বছ‌রের পর বছর গ্রাহক‌দের হয়রা‌নি ক‌রে যা‌চ্ছে। বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা সব কিছু জে‌নেও স‌ঠিক সময় স‌ঠিক ব‌্যবস্থা নি‌তে অপারগ। বীমা এজেন্ট এক‌টি আইনসিদ্ধ বিষয়। পৃ‌থিবীর বহু দে‌শে শুধু এজেন্ট দি‌য়েই বীমা প‌লি‌সি বিক্রয় হ‌য়ে থা‌কে। বর্তমা‌নে বাংলা‌দেশে বীমা প‌লি‌সি বিক্রয় সম্পূর্ণ এজেন্ট ভি‌ত্তিক। সুতরাং দে‌শের এজে‌ন্টে‌দের মাঠ পর্যা‌য়ে বি‌ভিন্ন সমস‌্যায় রে‌খে বীমা ব‌্যবসা‌র সম্প্রসারণ সম্ভব নয়।

মাঠ পর্যা‌য়ে এজেন্ট অসন্তোষ রো‌ধে করণীয়:

বীমা শি‌ল্পের প্রতি মানু‌ষের আস্থার অভা‌বের কার‌নে বীমা এজেন্ট হ‌তে মানু‌ষের আগ্রহ কম। তরুন মেধাবীরা সহ‌জে এই পেশায় ক‌্যা‌রিয়ার গড়‌তে চায় না। তাছাড়া কোম্পা‌নির দা‌বি পরি‌শো‌ধের গ‌ড়িম‌সি করার জন‌্য মাঠ পর্যায়ের এজেন্ট ও গ্রাহ‌কের সা‌থে বাক‌বিতণ্ডা বাড়‌ছে। এজেন্ট অসন্তোষ রো‌ধে আমাদের করণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা হ‌লো।

  • বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ কর্তৃক নির্ধা‌রিত মাঠ পর্যা‌য়ের উন্নয়ন কর্মী‌দের পদ-পদবী নির্ধারণ করতে হ‌বে এবং কর্তৃপ‌ক্ষের এজেন্ট নি‌য়ো‌গে তদার‌কি বাড়া‌তে হ‌বে।
  • সময় উপ‌যো‌গী ক‌মিশন বা বেতন কাঠা‌মো নির্ধারণ কর‌তে হ‌বে।
  • এজে‌ন্টের ক‌মিশন বা বেতন এজে‌ন্টের নিজ ব‌্যাংক হিসা‌বে প্রেরণ কর‌তে হ‌বে।
  • নিয়‌মিত ‌কোম্পা‌নি কর্তৃক বীমা বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব‌্যবস্থা কর‌তে হ‌বে এবং কোম্পা‌নি কর্তৃক এজেন্টদের প‌রিচয়পত্র প্রদান কর‌তে হ‌বে।
  • প্রফি‌ডেন্ড ফান্ডসহ অন‌্যান‌্য চাক‌রিকা‌লীন সু‌যোগ সু‌বিধা দি‌তে হ‌বে।
  • এস‌বি/ মৃত‌্যু দাবী/ ম‌্যাচু‌রি‌টি যথাসম‌য়ে গ্রাহ‌ককে প‌রি‌শোধ কর‌তে হ‌বে।
  • কোম্পা‌নির প্রশাস‌নিক কর্মকর্তাগণ মাঠ পর্যা‌য়ের এজে‌ন্টেদের সা‌থে সমন্নয় রে‌খে কাজ কর‌তে হ‌বে।
  • কোম্পা‌নির বি‌ভিন্ন প্রমোশনাল ম‌্যা‌সেজ ও গ্রাহ‌কের প্রিমিয়াম এবং গ্রাহকসেবার তথ‌্য সরাস‌রি বা এসএমএস এর মাধ‌্যমে গ্রাহক‌কে অবগত কর‌তে হ‌বে।
  • প্রিমিয়া‌ম আদা‌য়ে ই-রি‌সিপ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কর‌তে হ‌বে।
  • কোম্পা‌নির আর্থিক দায় কোনভা‌বেই এজে‌ন্টের ওপর চাপা‌নো যা‌বে না।
  • গ্রাহ‌কের কাছ থে‌কে কোম্পা‌নির ম‌নো‌নীত ব্যাংকের মাধ‌্যমে প্রিমিয়াম আদায় ক‌রে তা গ্রাহ‌ককে এসএসএস এর মাধ‌্যমে জমা বিষয় জানা‌তে হ‌বে।
  • শি‌ক্ষিত তরুন‌দের এজেন্ট হি‌সে‌বে নি‌য়ো‌জিত করার জন‌্য বি‌ভিন্ন সে‌মিনার ও ওয়ার্কশপ এবং প্রচার বাড়া‌তে হ‌বে।

 স‌র্বোপ‌রি বীমায় গ্রাহক সেবা বৃ‌দ্ধির পাশাপা‌শি এজে‌ন্টের সামা‌জিক ও আর্থিক গুরুত্বের বিষয়ে কোম্পা‌নির সু-নজর দি‌তে হ‌বে।

লেখক: রি‌জিওনাল হেড, এলআইসি বাংলাদেশ লিমিটেড।