ক্লেইমে অতিরিক্ত ভেরিফিকেশন: সময়ক্ষেপণ কমানো জরুরি

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে বীমা খাতের সম্ভাবনা নিয়ে বহু আলোচনা হয়। কিন্তু বাস্তব আস্থা তৈরি হয় একটি জায়গায় এসে- ক্লেইম সেটেলমেন্টে। কারণ বীমা কোনো বিলাসী পণ্য নয়; এটি অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সামাল দেয়ার আর্থিক চুক্তি। পরিবারপ্রধানের মৃত্যু, বড় দুর্ঘটনা বা ব্যয়বহুল চিকিৎসা- এসব সংকটে মানুষ বীমাকে শেষ ভরসা ভেবে প্রিমিয়াম দেন। অথচ সেই সংকটের মুহূর্তে যদি গ্রাহককে ঘুরতে হয় কাগজপত্রের দফতরে, বারবার শুনতে হয় ‘আরেকটি কাগজ লাগবে’, কিংবা মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়- তাহলে প্রতিশ্রুতির ব্যবসা বিশ্বাস হারায়। এই আস্থা সংকট শুধু ভুক্তভোগী পরিবারকে নয়; দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, সঞ্চয় প্রবণতা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামোকেও দুর্বল করে।

ক্লেইম প্রক্রিয়ায় নথি যাচাই অবশ্যই প্রয়োজন। তবে তা যেন যুক্তিসংগত ও মানবিক হয়। বাস্তবে পাওয়া অভিযোগ/অভিজ্ঞতা অনুযায়ী অনেক ক্ষেত্রে একই তথ্য বিভিন্ন ফরমে বারবার চাওয়া হয়, হাসপাতালের রিপোর্ট বা ডায়াগনোসিস থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ভেরিফিকেশনের যুক্তিতে ফাইল আটকে থাকে, কিংবা ছোটখাটো অসঙ্গতি বা টাইপোগ্রাফিক ভুলকে বড় কারণ হিসেবে ধরা হয়। শহরে বসবাসকারীর জন্যও এটি হয়রানি; জেলা-গ্রামে থাকা গ্রাহকের ক্ষেত্রে তা কখনও কখনও অচলাবস্থায় পরিণত হয়। যাতায়াত, নথি সংগ্রহ, নোটারি/সত্যায়ন- সব মিলিয়ে খরচ বাড়ে, সময় নষ্ট হয় এবং মানসিক চাপও বাড়তে থাকে। সবচেয়ে বড় কথা, যে সময়ে পরিবার দ্রুত আর্থিক সহায়তা চায়, ঠিক সে সময়েই প্রক্রিয়াটি ধীরগতির দেয়ালে আটকে যায়।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো দাবি বাতিলের স্বচ্ছতা। অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহক স্পষ্টভাবে জানতে পারেন না যে, কোন শর্তটি লঙ্ঘিত হয়েছে বা কোন তথ্যকে কেন অপর্যাপ্ত ধরা হলো। বিক্রির সময় শর্তাবলি পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা না করা, জটিল ভাষায় পলিসি ডকুমেন্ট এবং বিক্রয়কেন্দ্রিক প্রণোদনা- সব মিলিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়। ফলে নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ চললেও বিপদের দিনে শুনতে হয়- ‘পলিসির আওতায় পড়ে না’। এই অভিজ্ঞতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, পাড়া ও সামাজিক মাধ্যমে- আর নতুন গ্রাহক তৈরির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

সমাধান তাই কেবল আরও নথি নয়; সমাধান হলো নীতিগত শৃঙ্খলা ও সেবাকেন্দ্রিক সংস্কার।

  • ন্যূনতম কাগজপত্রের মানদণ্ড একীভূত ও বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ক্লেইম নিষ্পত্তি না হলে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
  • ডিজিটাল ট্র্যাকিং ও নিয়মিত স্ট্যাটাস আপডেট মানক সেবা হিসেবে চালু করতে হবে।
  • দাবি বাতিল হলে লিখিত ও যাচাইযোগ্য কারণ জানানো বাধ্যতামূলক করতে হবে।

বীমা খাতের সম্প্রসারণের কেন্দ্রবিন্দুতে যে বিশ্বাস- তা ফিরিয়ে আনতে হলে ক্লেইম সেটেলমেন্টকে বাধা নয়, সেবা হিসেবে নতুন করে নির্মাণ করাই এখন সময়ের দাবি।