ভারতে ইন্স্যুরেন্স কভারেজ বাড়াতে বাজেট পরিকল্পনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতের সার্বজনীন বীমা কভারেজ (ইউনিভার্সাল ইন্স্যুরেন্স কভারেজ) অর্জনের লক্ষ্য সামনে রেখে ২০২৬ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে (ফেব্রুয়ারি) বীমা খাতে বড় ধরনের নীতিগত উদ্যোগ আসতে পারে- এমন আলোচনা বাজেট-পূর্ব নীতিনির্ধারক ও শিল্প-সংশ্লিষ্ট মহলে ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে গ্রামীণ নারীদের জন্য একটি বিশেষ বীমা পণ্য চালুর সম্ভাবনা, যা প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (পিএমজেডিওয়াই) অ্যাকাউন্টের সঙ্গে সংযুক্ত করে দেশজুড়ে বীমা-অন্তর্ভুক্তিকে দ্রুততর করার কৌশল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

এই সম্ভাব্য উদ্যোগের শক্তি নিহিত রয়েছে জন ধন যোজনার বিস্তৃত পরিসরে। সরকারী তথ্য অনুযায়ী পিএমজেডিওয়াই-এর আওতায় ৫৫ কোটিরও বেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, যার উল্লেখযোগ্য অংশ নারী গ্রাহকদের নামে। ফলে জন ধনকে ‘ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে ব্যবহার করলে বীমা গ্রহণের সবচেয়ে বড় বাধা- নিবন্ধন, আলাদা কাগজপত্র, শাখায় যাওয়া এবং তথ্য-অভাবজনিত অনীহা- অনেকটাই কমানো সম্ভব হতে পারে। নীতিগতভাবে, নির্দিষ্ট বীমা পণ্যকে জন ধন অ্যাকাউন্টের সঙ্গে যুক্ত করে দিলে বড় সংখ্যক গ্রামীণ নারী নতুন করে আলাদা প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সরাসরি কভারেজের আওতায় আসতে পারেন- যা বীমা-বিস্তারে একটি স্কেলযোগ্য পথ তৈরি করে।

এখানে আলোচ্য বিষয়টি শুধু কভারেজ বাড়ানো নয়; বরং লক্ষ্যভিত্তিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা। গ্রামীণ নারীদের ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, স্বাস্থ্যঝুঁকি, আয়হানি বা পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্যের বিপদ- এসব ধাক্কা অনেক সময়ই সঞ্চয়শূন্য পরিবারের জন্য তাৎক্ষণিক আর্থিক সংকট তৈরি করে, যার প্রভাব পড়ে শিক্ষা, পুষ্টি ও চিকিৎসা ব্যয়ের ওপর। তাই জন ধন-সংযুক্ত বিশেষ বীমা পণ্য বাস্তবায়িত হলে সেটি শুধু একটি আর্থিক পরিষেবা নয়, বরং অনিশ্চয়তার মুখে পরিবারের ন্যূনতম স্থিতি ধরে রাখার একটি কার্যকর নিরাপত্তা বলয় হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে জান সুরক্ষা যোজনা-র আওতাভুক্ত সামাজিক সুরক্ষার বিভিন্ন উদ্যোগকে জন ধন প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে একীভূত করার সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে, যাতে গ্রাহকের অভিজ্ঞতা সহজ হয় এবং সুবিধাগুলো একটি পরিচিত ব্যাংকিং ‘রুটিন’-এর মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে যুক্ত থাকে।

বাজেট আলোচনায় বীমাকে আরও সাশ্রয়ী করার ইঙ্গিতও রয়েছে। কারণ কম আয়ের পরিবারের কাছে বীমার চাহিদা থাকলেও প্রিমিয়াম পরিশোধের ধারাবাহিকতা, সময়মতো কাটাকাটি এবং সুবিধা সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা- এই তিনটি জায়গায় বাস্তব বাধা তৈরি হয়। নীতি-পর্যায়ে যদি প্রিমিয়াম পরিশোধকে সহজ করার ব্যবস্থা, ন্যূনতম ব্যয়ে অর্থবহ কভারেজ, অথবা ডিজিটাল-অটোডেবিটভিত্তিক সুবিধাজনক পেমেন্ট মডেলকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, তাহলে ‘বীমা আছ’ আর ‘বীমা কার্যকরভাবে চালু আছে’- এই ব্যবধান কমতে পারে। আর গ্রামীণ নারীদের জন্য আলাদা পণ্য হলে তা ভাষা, দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া এবং স্থানীয় স্তরে সচেতনতা বৃদ্ধির কৌশলেও আরও বাস্তবসম্মত হওয়া দরকার- এমন মতামতও সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে কৃষকদের সুরক্ষাও বাজেটের বড় আলোচ্য ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে, বিশেষ করে ফসল ও জলবায়ু ঝুঁকি বীমায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্যা, তাপপ্রবাহ, ঘূর্ণিঝড়সহ আবহাওয়াজনিত চরমতার প্রকৃতি ও ঘনত্ব বদলাচ্ছে। যার ফলে কৃষি উৎপাদন অনিশ্চিত হচ্ছে এবং আয়-ঝুঁকি বাড়ছে। এই বাস্তবতায় ফসল বীমা ও জলবায়ু ঝুঁকি বীমা কাঠামো শক্তিশালী করতে বাড়তি বরাদ্দ বৃদ্ধি, ঝুঁকির সংজ্ঞা আরও বিস্তৃত করা, কিংবা দুর্যোগভিত্তিক ক্ষতিপূরণকে দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য করার মতো উদ্যোগ আলোচনায় থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু ঝুঁকি যদি যথাযথভাবে কভারেজে অন্তর্ভুক্ত হয়, তাহলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ক্ষতির সময় কৃষকের হাতে দ্রুত আর্থিক সহায়তা পৌঁছাবে- যা গ্রামীণ অর্থনীতির চক্রকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০২৬ সালের বাজেটকে কেন্দ্র করে যে ‘ইন্স্যুরেন্স পুশ’-এর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তার তাৎপর্য এক জায়গায়- বীমাকে শহরকেন্দ্রিক আর্থিক পণ্য থেকে বের করে গ্রামীণ জীবনের দৈনন্দিন ঝুঁকি-ব্যবস্থাপনার মূল স্তম্ভে পরিণত করার চেষ্টা। তবে সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সূক্ষ্মতায়- প্রিমিয়াম কতটা সাশ্রয়ী ও নিয়মিত পরিশোধযোগ্য হবে, কভারেজ কতটা বাস্তব ঝুঁকি মোকাবিলায় কার্যকর হবে এবং দাবি নিষ্পত্তি কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও কম-জটিল হবে। বাজেট ঘোষণার পরই প্রস্তাবিত পণ্যের কাঠামো, কভারেজ সীমা ও বাস্তবায়ন-পদ্ধতির চূড়ান্ত ছবি স্পষ্ট হবে; কিন্তু যদি জন ধনকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ নারী ও কৃষকের সুরক্ষাকে একসূত্রে গাঁথার উদ্যোগ বাস্তব রূপ পায়, তাহলে ২০৪৭ সালের সার্বজনীন বীমা কভারেজের পথে এটি হতে পারে সময়োপযোগী ও কার্যকরী এক পদক্ষেপ। (সংবাদ সূত্র: এশিয়া ইন্স্যুরেন্স রিভিউ)