বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যার কেন এখন জরুরি

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশে আর্থিক সেবার ডিজিটাল রূপান্তর এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ। মানুষ লেনদেন, বিল পরিশোধ, কেনাকাটা ও বিভিন্ন সেবা মোবাইলেই সম্পন্ন করতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এই অভ্যাসের সঙ্গে বদলেছে প্রত্যাশাও। গ্রাহক এখন দ্রুত সেবা, পরিষ্কার তথ্য এবং সহজ যোগাযোগকে স্বাভাবিক মানদণ্ড হিসেবে ধরে নেয়। এই পরিবর্তনের ভেতর বীমা খাত যদি এখনও কাগজপত্র, ম্যানুয়াল যাচাই এবং দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে থাকে, তাহলে আস্থা ও প্রতিযোগিতা- দুটো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। তাই ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যার এখন শুধু আধুনিকতার বিষয় নয়; এটি বীমা খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নেয়ার বাস্তব শর্ত।
ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যার বলতে এমন একটি সমন্বিত ডিজিটাল ব্যবস্থা বোঝায়, যেখানে নীতিমালা তৈরি ও ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, প্রিমিয়াম সংগ্রহ, বিলিং, ক্লেইম প্রক্রিয়াকরণ, ডকুমেন্ট সংরক্ষণ, রিপোর্টিং এবং গ্রাহক সেবা একসাথে পরিচালিত হয়। এর মূল শক্তি হলো শৃঙ্খলিত ওয়ার্কফ্লো। কাজ কোথায় আছে, কোন সিদ্ধান্ত কেন নেয়া হয়েছে, কী ডকুমেন্ট বাকি, কে কোন ধাপে দায়িত্বে আছে- এ ধরনের বিষয়গুলো দৃশ্যমান ও যাচাইযোগ্য থাকে। ফলে প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নিতে পারে দ্রুত এবং গ্রাহক সেবা পায় বেশি স্বচ্ছভাবে।
বাংলাদেশে ডিজিটালাইজেশনের চাপ বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো ক্লেইম অভিজ্ঞতা। বীমায় গ্রাহকের আস্থা সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা হয় তখনই, যখন ক্ষতি হয় এবং দাবি নিষ্পত্তির প্রয়োজন পড়ে। দীর্ঘ সময়, অস্পষ্ট নিয়ম, বারবার কাগজ চাওয়া, কিংবা আপডেট না পাওয়া- এসব কারণে মানুষ বীমার ওপর আস্থা হারায়। ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যার এই জায়গায় বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, কারণ ক্লেইম জমা, যাচাই, অনুমোদন, এবং নিষ্পত্তি- সব ধাপ ট্র্যাকযোগ্য হয়। এতে সময় কমে, যোগাযোগ সহজ হয় এবং অভিযোগ কমার সম্ভাবনা বাড়ে।
কাগজনির্ভরতার ঝুঁকিও বাংলাদেশে বড় বাস্তবতা। কাগজ হারিয়ে যাওয়া, তথ্য ভুল লেখা, একই তথ্য ভিন্নভাবে থাকা, নথির সত্যতা যাচাই করতে না পারা- এসব সমস্যা একদিকে অপারেশনাল ব্যয় বাড়ায়, অন্যদিকে জালিয়াতির সুযোগ তৈরি করে। ডিজিটাল ডকুমেন্ট ম্যানেজমেন্ট, অডিট ট্রেইল এবং স্বয়ংক্রিয় যাচাই ব্যবস্থার ফলে প্রতিষ্ঠান ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ পায় এবং ঝুঁকি কমাতে পারে। একইসাথে ডেটা-চালিত রিপোর্টিং ও অ্যানালিটিক্স থাকলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, পণ্য উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত আরও বাস্তবভিত্তিক হতে পারে।
গ্রাহক অভিজ্ঞতার দিক থেকেও পরিবর্তন অনিবার্য। গ্রাহক যদি নিজের অ্যাকাউন্টে ঢুকে পলিসি দেখতে পারে, প্রিমিয়াম দিতে পারে, রিনিউয়াল করতে পারে, প্রয়োজনীয় কাগজ জমা দিতে পারে, কিংবা ক্লেইমের স্ট্যাটাস জানতে পারে- তাহলে বীমা তার কাছে একটি সহজ সেবা হয়ে ওঠে। দ্রুত নোটিফিকেশন, ডিজিটাল সাপোর্ট এবং আত্মসেবার সুযোগ থাকলে গ্রাহককে শাখা অফিসে ঘুরতে হয় না, কল সেন্টারে অপেক্ষা করতে হয় না। ফলে বীমার সঙ্গে যে মানসিক দূরত্ব কাজ করে, তা কমে আসে।
বাংলাদেশে একটি বিশেষ বাস্তবতা হলো এজেন্ট-ভিত্তিক বিক্রয় কাঠামো ও স্থানীয় ইকোসিস্টেম। পেমেন্ট চ্যানেল, এসএমএস যোগাযোগ, পরিচয় যাচাই, স্থানীয় নথির ধরন এবং গ্রাহকের ভাষাভিত্তিক প্রয়োজন- এসবকে সফটওয়্যার নকশায় গুরুত্ব না দিলে ডিজিটাল উদ্যোগ কার্যকারিতা হারাতে পারে। তাই কেবল বিদেশি প্রস্তুত সমাধান এনে বসালে অনেক সময় স্থানীয় খাপ খাওয়ানোর ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। আবার পুরোপুরি কাস্টম সমাধান করতে গেলে সময়, ব্যয় ও রক্ষণাবেক্ষণের সক্ষমতা দরকার হয়। বাংলাদেশের জন্য যুক্তিযুক্ত পথ হলো এমন একটি সমন্বিত কৌশল, যেখানে মূল অপারেশনাল অংশ স্থিতিশীল থাকে, কিন্তু গ্রাহক অভিজ্ঞতা, এজেন্ট প্যানেল এবং ইন্টিগ্রেশন স্তর স্থানীয় বাস্তবতা অনুযায়ী সাজানো হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, প্রযুক্তি বসালেই পরিবর্তন নিশ্চিত হয় না। সফটওয়্যারকে যদি প্রদর্শনীর বস্তু বানানো হয়, আর প্রক্রিয়া ও দায়িত্ব কাঠামো আগের মতোই থাকে, তাহলে ডিজিটাল রূপান্তর কেবল স্ক্রিনে পুরনো জটিলতাই দেখাবে। এজন্য চেঞ্জ ম্যানেজমেন্ট অপরিহার্য- কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নতুন কাজের ধারা, পরিষ্কার দায়িত্ব বণ্টন এবং পারফরম্যান্স মাপার পদ্ধতি আপডেট না হলে ফল আসবে না। একই সাথে ডেটা সিকিউরিটি ও প্রাইভেসি এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়, কারণ বীমায় ব্যক্তিগত, আর্থিক এবং অনেক সময় স্বাস্থ্য সম্পর্কিত তথ্য থাকে। এসব তথ্য সুরক্ষিত না হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও গ্রাহকের আস্থা দ্রুত ভেঙে পড়তে পারে। অটোমেশন বা এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও মানবীয় তত্ত্বাবধান, ব্যাখ্যাযোগ্য সিদ্ধান্ত এবং অডিটযোগ্যতা থাকা জরুরি, যাতে ভুল সিদ্ধান্ত বা পক্ষপাত তৈরি না হয়।
বাংলাদেশের বীমা খাতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা। বিশ্বাস তৈরি হয় যখন সেবা দ্রুত, নিয়ম স্বচ্ছ এবং গ্রাহকের অভিজ্ঞতা সম্মানজনক হয়। ইন্স্যুরেন্স সফটওয়্যার এই তিন জায়গাতেই বাস্তব উন্নতি আনতে পারে- যদি প্রযুক্তিকে শো-পিস না বানিয়ে প্রক্রিয়া পুনর্গঠন, অটোমেশন এবং গ্রাহক-কেন্দ্রিক ডিজাইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। ডিজিটাল রূপান্তর এখন বীমার জন্য ঐচ্ছিক কিছু নয়; এটি প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা, আস্থা তৈরি করা এবং ভবিষ্যতের গ্রাহককে ধরে রাখার শর্ত।




