বীমা বাজারে লাইফ বীমা এগিয়ে, বাড়ছে গ্রাহকদের ঝোঁক

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের বীমা খাতে বর্তমানে লাইফ বীমা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পলিসির শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। সঞ্চয় ও আর্থিক নিরাপত্তার সমন্বয়ে তৈরি এসব পলিসি গ্রাহকদের কাছে বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা থাকায় মেয়াদভিত্তিক লাইফ বীমার চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রিমিয়াম আয়ের দিক থেকে লাইফ বীমা এখনো বাজারে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। মেটলাইফ বাংলাদেশের থ্রি পেমেন্ট প্ল্যান (এমথ্রিপিপি) এবং ডিপোজিটরস প্রোটেকশন স্কিম (এমডিপিএস)-এর মতো সঞ্চয়ভিত্তিক পলিসিগুলো গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে।

অন্যদিকে, সাধারণ বীমা খাতেও উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ২০২৪ সালে এ খাতে মোট প্রিমিয়াম সংগ্রহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬,৫০২ কোটি টাকায়। এ ক্ষেত্রে ফায়ার ও মেরিন বীমা সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে।

একই সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে স্বাস্থ্য বীমা পলিসির চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে কর্পোরেট গ্রুপ ও ব্যক্তিগত গ্রাহকদের মধ্যে এই প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বীমা দাবি (ক্লেইম) নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও লাইফ বীমা খাত শীর্ষে রয়েছে। মেটলাইফ বাংলাদেশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি মোট ২,৮৫৩ কোটি টাকার দাবি পরিশোধ করেছে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ এসেছে মেয়াদোত্তীর্ণ (ম্যাচিউরিটি) ও আংশিক মেয়াদোত্তীর্ণ দাবির মাধ্যমে, যা মোট দাবির প্রায় ৮৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে শুধু এই খাতেই মেটলাইফ প্রায় ২,৫১৮ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সংক্রান্ত দাবিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫ সালে এই খাতে দাবি ছিল ৩১৩ কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে।

অন্যদিকে, মৃত্যু দাবি তুলনামূলকভাবে কম হলেও এটি একটি নিয়মিত ও স্থিতিশীল খাত হিসেবে রয়েছে। ২০২৫ সালে এ খাতে ১১০ কোটি টাকার দাবি নিষ্পত্তি করা হয়েছে।

ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি বাংলাদেশের বীমা খাত এখনো নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো গ্রাহকদের আস্থার সংকট। অনেক প্রতিষ্ঠান সময়মতো দাবি পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে অনাস্থা তৈরি হয়েছে। গত ১৪ বছরে প্রায় ২৬ লাখ পলিসি বাতিল হওয়া এই সংকটের একটি বড় উদাহরণ।

একই সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও কমে যাওয়া ক্রয়ক্ষমতার কারণে নতুন পলিসি কেনা এবং নিয়মিত প্রিমিয়াম পরিশোধ অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এর ফলে ২০২৪ সালে লাইফ বীমা খাতের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৭.৩ শতাংশে, যা গত তিন বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বীমা খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে। অনেক কোম্পানি এখন অনলাইনে ক্লেইম জমা নেয়া এবং ৩ থেকে ৫ কার্যদিবসের মধ্যে দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চালু করেছে। এতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নতুন প্রজন্মের গ্রাহকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের বীমা বাজারে লাইফ বীমা এখনো প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে রয়েছে। তবে গ্রাহক আস্থা পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানো এবং প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে খাতটি ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছাতে পারে।