জিআইসি রি-তে ৫% শেয়ার বিক্রির পথে ভারত

প্রকাশিত: ২৬ জুলাই ২০২৬, ০৭:২৫ পিএম

এটি শুধু সরকারের আরেকটি শেয়ার বিক্রির সিদ্ধান্ত নয়। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের বীমা খাতে প্রতিযোগিতা বাড়ানো, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সুশাসন শক্তিশালী করার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ এই উদ্যোগ।

শেয়ার বিক্রি করা হবে অফার ফর সেল (ওএফএস) পদ্ধতিতে। প্রথম ধাপে ২ শতাংশ শেয়ার ছাড়া হবে। চাহিদা বেশি হলে অতিরিক্ত ৩ শতাংশ বিক্রির সুযোগ রাখা হয়েছে।

প্রতি শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫২ রুপি। পুরো ৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি হলে সরকারের প্রায় ৩,০৮৮ কোটি রুপি আয় হতে পারে। তবে এর পরও সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠ শেয়ারহোল্ডার হিসেবে প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবে।

জিআইসি রি ভারতের একমাত্র রাষ্ট্রীয় পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান। সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলো নিজেদের বড় অঙ্কের ঝুঁকির একটি অংশ এই প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে। ফলে বড় দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বিপুল অঙ্কের বীমা দাবি এলেও একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর পুরো আর্থিক চাপ পড়ে না। সহজভাবে বলতে গেলে, জিআইসি রি মূলত বীমা কোম্পানিগুলোরই বীমা করে।

এই উদ্যোগের আরেকটি লক্ষ্য হলো মুক্ত লেনদেনযোগ্য শেয়ারের পরিমাণ বাড়ানো। এতে দেশি-বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে ভারতের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা এসইবিআইয়ের ন্যূনতম ২৫ শতাংশ পাবলিক শেয়ারহোল্ডিংয়ের শর্ত পূরণেও অগ্রগতি হবে। বর্তমানে সরকারের হাতে জিআইসি রি-এর ৮২.৪ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। প্রস্তাবিত বিক্রি শেষ হলে তা কমে প্রায় ৭৭.৪ শতাংশে দাঁড়াবে।

ভারতের পুনর্বীমা খাতে জিআইসি রি এখনো সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান। দেশীয় খাতে এর অংশীদারিত্ব প্রায় ৫২ শতাংশ। বিশ্বের নবম বৃহত্তম পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এটি ১৩৭টিরও বেশি দেশে পুনর্বীমা সেবা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক রেটিং সংস্থা এ এম বেস্ট প্রতিষ্ঠানটিকে আর্থিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে ‘এ- (এক্সেলেন্ট)’ রেটিং দিয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ফলও শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গ্রস প্রিমিয়াম বেড়ে ৪৪,০০৭ কোটি রুপিতে পৌঁছেছে। আগের অর্থবছরে তা ছিল ৪১,১৫৪ কোটি রুপি। একই সময়ে নিট মুনাফা বেড়ে ৮,৩৯২ কোটি রুপিতে দাঁড়িয়েছে। সলভেন্সি রেশিও বেড়ে ৪২১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা বড় ধরনের বীমা দাবি পরিশোধের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

এই সিদ্ধান্ত এমন সময়ে এলো, যখন ভারতের নন-লাইফ বীমা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০২৬ সালের জুনে দেশটির গ্রস প্রিমিয়াম আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১৭ শতাংশ বেড়েছে। স্বাস্থ্যবীমার বিস্তার, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং জলবায়ুজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় বীমার চাহিদা বৃদ্ধিই এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তবে বৈশ্বিক পুনর্বীমা শিল্পের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। এর পাশাপাশি সাইবার হামলা, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা পুনর্বীমা কোম্পানিগুলোর ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে মূলধন সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং আন্ডাররাইটিং দক্ষতার গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।

সরকারের অংশীদারিত্ব কিছুটা কমলেও জিআইসি রি-এর কৌশলগত অবস্থানে তাৎক্ষণিক বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে শেয়ারের মুক্ত লেনদেন বাড়লে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ, শেয়ারের তারল্য এবং করপোরেট সুশাসনে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই অনেক বিশ্লেষক এই উদ্যোগকে শুধু একটি শেয়ার বিক্রি হিসেবে দেখছেন না; বরং ভারতের বীমা ও আর্থিক খাতকে আরও বিনিয়োগবান্ধব ও প্রতিযোগিতামূলক করার দীর্ঘমেয়াদি নীতির অংশ বলেই মনে করছেন।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।