জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি: বিপাকে বীমা এজেন্টরা, ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিয়ে শঙ্কায় কোম্পানি

প্রকাশিত: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪৪ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। এক বছরের কম সময়ের ব্যবধানে তেলের দাম গড়ে ৩৩ শতাংশ বেড়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর ফুয়েল, ট্রাভেলিং, কনভেয়েন্স, এন্টারটেইনমেন্টসহ বেশ কিছু খাতে খরচ বেড়ে যাবে। এমন পরিস্থিতিতে বীমা কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নির্ধারিত আইনি সীমা কতটা ধরে রাখতে পারবে- তা নিয়ে তৈরি হয়েছে আশঙ্কা।

সরকার দেশের বাজারে সব ধরনের জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়িয়েছে। গত সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) মধ্যরাত থেকে এই নতুন মূল্য তালিকা কার্যকর হয়েছে। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা।

এর আগে ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ (ডিসেম্বর মাসে) দেশে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি লিটার ডিজেল ১০৪ টাকা, কেরোসিন ১১৬ টাকা, পেট্রোল ১২০ টাকা এবং অকটেন ১২৪ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। এই হিসাবে এক বছরের কম সময়ের মধ্যে অকটেনের দাম ৪১ টাকা বা ৩৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

তবে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির ফলে মাঠপর্যায়ে ব্যবসা সংগ্রহের খরচ আগের চেয়ে অনেক বাড়লেও কমিশন হার বাড়ছে না বীমা এজেন্টদের। একইভাবে বীমা কোম্পানিগুলোর সুপারভিশনে থাকা উন্নয়ন কর্মকর্তাদেরও জ্বালানি খরচ বাড়বে। ফলে আয়ের তুলনায় পকেটের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কমিশন-ভিত্তিক বীমা কর্মী ও কর্মকর্তাদের মধ্যে নতুন পলিসি বিক্রির আগ্রহ কমে আসতে পারে।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি লাইফ বীমা কোম্পানির মাঠপর্যায়ের এক এজেন্ট বলেন, আমরা মূলত মোটরসাইকেল নিয়ে সারাদিন গ্রাহকদের দ্বারে দ্বারে ঘুরি। তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, তাতে আমাদের যাতায়াত খরচই প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের কমিশন রেট আগের মতোই আছে। এভাবে পকেটের টাকা খরচ করে নতুন পলিসি বিক্রি করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

আরেকজন বীমা কর্মী হতাশা প্রকাশ করে জানান, শুধু বাইকের তেল নয়, যাতায়াতের পথে অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচও বেড়েছে। কোম্পানি থেকে আমাদের যাতায়াত ভাতা বা অন্য কোনো সুবিধাও বাড়ানো হয়নি। আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই এখন নতুন পলিসি সংগ্রহের আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন।

এদিকে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক খরচও বাড়ছে। আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুসারে, বীমা কোম্পানির চেয়ারম্যান ও মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তারা কোম্পানির তহবিল থেকে সর্বোচ্চ ৪০ লাখ টাকা মূল্যের একটি করে গাড়ি ব্যবহার করতে পারেন। একইভাবে কোম্পানির পরিবহন পুলে ৪টি গাড়ি ব্যবহার করতে পারে, যার সর্বোচ্চ মূল্য ২৫ লাখ টাকা। এছাড়া ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্যও গাড়ির বরাদ্দ রয়েছে।

লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব কোম্পানির মধ্যে একটি লাইফ বীমা কোম্পানিতেই প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলসহ মোট যানবাহনের সংখ্যা ২৬৮টি।

অপরদিকে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ২০১৮ সালের তথ্য অনুসারে, দেশের ২৮টি লাইফ বীমা কোম্পানি ১ হাজার ৮৪১টি গাড়ি এবং ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানি ১ হাজার ১২৮টি গাড়ি ব্যবহার করেছে। এসব নিজস্ব গাড়ির তেল খরচ এবং ট্রাভেল কনভেন্স খাতের খরচ কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় হিসেবে গণ্য হয়।

জ্বালানি সংশ্লিষ্ট খরচের বিষয়ে ধারণা নিতে দেশের ২৩টি লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ১১টি লাইফ বীমা কোম্পানি তেল কিনতে খরচ করেছে ১২ কোটি ৩৬ লাখ ৩১ হাজার ৮৭১ টাকা। অপরদিকে ১২টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির তেল কিনতে খরচ হয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৫৫৪ টাকা।

তেলের দাম ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধির ফলে ২০২৬ সালে এই খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে যাবে। এক্ষেত্রে ওই ১১টি লাইফ বীমা কোম্পানির খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ১৬ কোটি ৩১ লাখ ৯৪ হাজার ৭০ টাকায়, যা আগের তুলনায় ৩ কোটি ৯৫ লাখ ৬২ হাজার ১৯৯ টাকা বেশি। নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর খরচও বাড়বে একই হারে।

বীমা আইন ২০১০ অনুসারে, নির্ধারিত সীমার বেশি ব্যবস্থাপনা ব্যয় করা অপরাধ। অতিরিক্ত ব্যয়ের অপরাধে বীমা আইনে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। এই বিষয়ে লাইফ ও নন-লাইফ বীমা খাতে পৃথক দু’টি বিধিমালাও জারি করেছে সরকার- নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০১৮ ও লাইফ ইন্স্যুরেন্স ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণী বিধিমালা-২০২০।

তবে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়লে নিয়ন্ত্রক সংস্থা তা বিবেচনা করবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো নির্দেশনা জারি করেনি বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।

সার্বিক বিষয়ে বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরাম (বিআইএফ)’র জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল এস এম নুরুজ্জামান বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব বীমা কোম্পানিগুলোর পরিচালন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের ওপর পড়বে। কোম্পানিগুলোর নিজস্ব গাড়িগুলোর তেল খরচ এবং কর্মীদের যাতায়াত ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাবে।

এমন পরিস্থিতিতে আইডিআরএ যদি ব্যবস্থাপনা ব্যয়ের নির্ধারিত আইনি সীমা শিথিল বা সমন্বয় না করে, তবে অনেক কোম্পানিই অনিচ্ছাসত্ত্বেও জরিমানার মুখে পড়বে। আমরা আশা করছি, নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত একটি যৌক্তিক নির্দেশনা জারি করবে- বলেন বিআইএফ’র জয়েন্ট সেক্রেটারি জেনারেল এস এম নুরুজ্জামান।

তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ব্যবস্থাপনা ব্যয় বাড়ার শঙ্কা নিয়ে জানতে চাইলে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র মুখপাত্র সাদিক আরমান বলেন, জ্বালানির বর্তমান দরবৃদ্ধি সম্পর্কে আইডিআরএ অবগত রয়েছে। এই প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবে কর্তৃপক্ষ।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।