আবদুর রহমান আবির: দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে উত্থাপিত মোট দাবির বড় অংশই বকেয়া থাকছে বছরের পর বছর। ফলে খাতজুড়ে তৈরি হওয়া গ্রাহকের অনাস্থা আরো বাড়ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’র সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, খাতটিতে ব্যবসা পরিচালনা করা সরকারি-বেসরকারি ৪৬টি নন-লাইফ বীমা কোম্পানির মধ্যে অন্তত ৩৪টি প্রতিষ্ঠানের দাবি নিষ্পত্তির হার ৭৫ শতাংশের নিচে।
এমন পরিস্থিতিতে বীমা খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং গ্রাহকের আস্থা পুনর্গঠনে কম নিষ্পত্তি করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মোট দাবির কমপক্ষে ৭০ শতাংশ পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । একইসঙ্গে ৯০ দিনের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা পুরোনো বকেয়া দাবিগুলো আগামী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
আইডিআরএ বলছে, বর্তমান সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থা বীমা খাতের সার্বিক উন্নয়ন ও সংস্কারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও দাবি নিষ্পত্তির এই ধীরগতি সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কোম্পানিগুলোকে বিদ্যমান নীতিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করে অবিলম্বে বকেয়া পরিশোধ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দেশ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে বীমা আইন, ২০১০ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং ধারাবাহিক লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে শাস্তির মাত্রা আরও বাড়ানো হবে বলে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
আইডিআরএ’র সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, নন-লাইফ কোম্পানিগুলোর পূর্ববর্তী বকেয়া দাবির পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৫৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা। নতুন করে আরও ১ হাজার ৬২৮ কোটি ৯০ লাখ টাকার দাবি যুক্ত হওয়ায় মোট উত্থাপিত দাবির পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৬৭৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকায়। তবে এই বিশাল দায়ের বিপরীতে কোম্পানিগুলো নিষ্পত্তি করতে পেরেছে ১ হাজার ১৬৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট বীমা দাবির ২৫ শতাংশ।
তালিকার শীর্ষে থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা করপোরেশনের মোট ২ হাজার ৪৮৬ কোটি ৪৬ লাখ টাকার বীমা দাবির মধ্যে পরিশোধ হয়েছে ২৯৯ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, যার নিষ্পত্তির হার ১২.০৬ শতাংশ। বেসরকারি খাতের বড় কোম্পানি গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের ৪১১ কোটি ২ লাখ টাকার দাবির বিপরীতে পরিশোধ হয়েছে ৮১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। কোম্পানিটির বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ১৯.৮২ শতাংশ।
প্রগতি ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ৩৪.৪৭ শতাংশ। কোম্পানিটিতে ১৯৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা বীমা দাবির বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে ৬৮ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। রিলায়েন্স ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ২৯.৮৮ শতাংশ। কোম্পানিটিতে উত্থাপিত ২০০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা বীমা দাবির বিপরীতে পরিশোধ করা হয়েছে ৫৯ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
অপরদিকে পিপলস ইন্স্যুরেন্সের দাবি নিষ্পত্তির হার ৬.৪৭ শতাংশ; নর্দার্ন ইসলামী ইন্স্যুরেন্সের ৬.৬৯ শতাংশ; বাংলাদেশ কো-অপারেটিভ ইন্স্যুরেন্সের ৭.৯৪ শতাংশ; রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের ১৫.০৩ শতাংশ; স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স ১৫.৩৮ শতাংশ এবং ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশের দাবি নিষ্পত্তি হার ১৬.৪০ শতাংশ।
এ ছাড়াও দেশ জেনারেল ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ১৭.১৪ শতাংশ; অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের ২০.২০ শতাংশ; গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সের ২২.২১ শতাংশ; মেঘনা ইন্স্যুরেন্স ২৩.৭৩ শতাংশ; ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্সের ৩১.০৮ শতাংশ এবং ফিনিক্স ইন্স্যুরেন্সের বীমা দাবি নিষ্পত্তির হার ৩১.২০ শতাংশ।
বীমা খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নন-লাইফ খাতে প্রিমিয়াম আয়ের একটি বড় অংশ পুনর্বীমা ও ব্যবস্থাপনা ব্যয়ে অপব্যবহার হওয়ায় অনেক সময় দাবির দায় মেটাতে সংকটে পড়ে কোম্পানিগুলো। ফলে যথাসময়ে দাবি না পেয়ে গ্রাহকদের মধ্যে বীমা শিল্প নিয়ে তীব্র অনাস্থা তৈরি হয়েছে। আইডিআরএ’র এই কঠোর পর্যবেক্ষণ ও নির্দিষ্ট সময়সীমা বাস্তবায়ন হলে গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
বীমা দাবি পরিশোধের ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নির্দেশনার বিষয়ে কন্টিনেন্টাল ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আমিনুর রহমান বলেন, আমাদের কোম্পানিতে এরইমধ্যে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা যথাযথভাবে পরিপালন করা হয়েছে। বর্তমানে আমাদের দাবি পরিশোধের হার ৭০ শতাংশেরও বেশি। এছাড়া, আমাদের অভ্যন্তরীণ কোনো কারণে কোনো বীমা দাবি ৯০ দিনের বেশি অনিষ্পন্ন বা আটকে থাকে না।
সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী বলেন, বীমা দাবি পরিশোধের বিষয়ে আইডিআরএ’র দেয়া নির্দেশনা এরইমধ্যে আমাদের কোম্পানিতে পরিপালন করা হয়েছে। তাছাড়া, আমরা বরাবরই বীমা দাবি পরিশোধের ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন। গত তিন বছর ধরে আমাদের বীমা দাবি পরিশোধের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে; যেটা সামনের দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
সিকদার ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ আবদুর রফিক বলেন, নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো গ্রাহকের দাবি পরিশোধ করতে চায় না- এমন ধারণা সঠিক নয়। মূলত পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান বা এসবিসি’র অনুমোদন, সার্ভে রিপোর্ট এবং ক্ষতি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় নথিপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত আইনি প্রক্রিয়ার কারণে কোনো দাবি পরিশোধ করা সম্ভব হয় না। এসব কাগজপত্র একত্রিত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়, যার ফলে দাবি পরিশোধে বিলম্ব ঘটে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, অনেক সময় ঝুঁকির ভিন্নতার (রিস্ক ফ্যাক্টর) কারণেও জটিলতা তৈরি হয়। যেমন, কোনো গ্রাহক হয়তো আংশিক ক্ষতির (পারশিয়াল লস) বিপরীতে বীমা সুবিধা নেননি, কিন্তু বাস্তবে তার আংশিক ক্ষতিই হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে গ্রাহক দাবি করলেও চুক্তি অনুযায়ী তা পরিশোধের সুযোগ থাকে না। এই বিষয়গুলো নিয়ে আপিল ও রি-আপিল প্রক্রিয়ার কারণেও সময়ক্ষেপণ হয়। এসব যৌক্তিক কারণেই নন-লাইফ বীমা দাবি পরিশোধে কিছুটা দেরি হতে পারে। তবে সব কোম্পানিই গ্রাহকের বৈধ দাবি সময়মতো পরিশোধের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে বলে তিনি মনে করেন।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।