আবদুর রহমান আবির: দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে ডিজিটাল নজরদারি এড়াতে জালিয়াতির এক নতুন কৌশল বেছে নিয়েছে কিছু অসাধু চক্র। গ্রাহকের প্রিমিয়ামের বড় অঙ্কের টাকা কোম্পানির ব্যাংক হিসাবে জমা না দিয়ে, তা সরাসরি আত্মসাৎ করতে তৈরি করা হচ্ছে সম্পূর্ণ জাল ও ডিজিটালি ম্যানিপুলেট করা ‘ই-রিসিপ্ট’ বা মানি রিসিপ্ট।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র নির্দেশিত সেন্ট্রাল সার্ভারকে পাশ কাটিয়ে আন্ডার-রেটিং ও প্রিমিয়াম গোপনের তথ্য উঠে এসেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র অনুসন্ধানে। জালিয়াতির এমন চিত্র মিলেছে সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স ও অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের নামে ইস্যু করা দুটি মানি রিসিপ্টের প্রাথমিক বিশ্লেষণে।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এর পেছনে কোম্পানিগুলোর অভ্যন্তরীণ অসাধু কর্মকর্তা, এজেন্ট বা শক্তিশালী ব্রোকার চক্র জড়িত রয়েছে। বিষয়টি দণ্ডবিধি অনুযায়ী জালিয়াতি এবং ইন্স্যুরেন্স আইন, ২০১০-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তাদের মতে, জাল মানি রিসিপ্টের কারণে প্রিমিয়ামের টাকা কোম্পানির তহবিলে জমা না হওয়ায় আইনগতভাবে কোনো বীমা চুক্তি বা পলিসি কার্যকর হয় না। ফলে ভবিষ্যতে কোনো বড় ক্ষয়ক্ষতি হলে গ্রাহকের কোটি কোটি টাকার বীমা দাবি সরাসরি বাতিল হয় এবং চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েন।
তথ্য অনুসারে, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ২০২১ সালের ১ অক্টোবর থেকে নন-লাইফ বীমা কোম্পানিগুলোর সনাতন পদ্ধতির হাতে লেখা বা সাধারণ প্রিন্ট করা মানি রিসিপ্ট সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে আইডিআরএ। একই বছরের ১ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ট্রায়াল পিরিয়ড শেষে তৎকালীন ইউএমপি (বর্তমান আইআইএমএস) ভিত্তিক অনলাইন কিউআর কোড যুক্ত ডিজিটাল ই-রিসিপ্ট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হয়।
তবে বীমা মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স এসোসিয়েশনের দাবির প্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে আইডিআরএ। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বীমা কোম্পানিগুলোর ডিজিটাইজেশন কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়ন শুরু হয়।
নিয়মানুযায়ী, এই কোড স্ক্যান করলে সরাসরি আইডিআরএ’র ইন্স্যুরেন্স ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (আইআইএমএস) বা সেন্ট্রাল সার্ভারে পলিসির সত্যতা যাচাই হওয়ার কথা। তবে অনুসন্ধানে, সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স ও অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের রশিদ দুটিতে এই নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।
সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের জালিয়াতি ও আইন লঙ্ঘন
ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র হাতে আসা সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের ইস্যু করা ফায়ার পলিসির একটি মানি রিসিপ্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে আইডিআরএ নির্দেশিত কোনো কিউআর কোডের অস্তিত্বই রাখা হয়নি। ডিজিটাল ব্যবস্থায় ইস্যু করা রশিদে কিউআর কোড না থাকাটা সরাসরি নিয়ন্ত্রক সংস্থার আদেশের লঙ্ঘন এবং এটি রশিদ জাল হওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের এলিট ব্রাঞ্চ থেকে ইস্যু করা হয়েছে এই মানি রিসিপ্ট, যার নম্বর- ৩৭০৮। এই মানি রিসিপ্টের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে ৫ লাখ ৭০ হাজার ১৬ টাকা প্রিমিয়াম গ্রহণ করা হয়েছে।
জালিয়াতির এই মানি রিসিপ্টে সিল-স্বাক্ষর রয়েছে- কোম্পানিটির ডিএমডি এন্ড হেড অব ব্রাঞ্চ মোহাম্মদ আবদুল কাদেরের। এসএআইসি/ইএলআই/এফসি-১১৫৩/১২/২০২৩ পলিসির বিপরীত ইস্যু করা এই মানি রিসিপ্টে ‘অরিজিনাল’ লেখা একটি সিলও দেয়া রয়েছে।
অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের ডিজিটাল কারসাজি
অপরদিকে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের মেরিন কার্গো বীমা পলিসির ৪৫ হাজার ৯৬ টাকার একটি মানি রিসিপ্ট এসেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র হাতে, যার নম্বর- সিটিজি/জেইউবি-২০২৬-১৭৩। কোম্পানির জুবিলী রোড শাখা থেকে এমপল অটোমোবাইলসের নামে এটি ইস্যু করা হয় ২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট। মেরিন কার্গো বীমার এই পলিসির নম্বর- এআইপিএলসি/সিটিজি/জেইউবি-০১৫১/০৮/২০২৬।
অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের এই মানি রিসিপ্টে কিউআর কোড ব্যবহার করা হলেও সেটি স্ক্যান করলে নিয়ম অনুসারে সরাসরি আইডিআরএ’র ইউএমপি (বর্তমান আইআইএমএস) সার্ভারের কোন তথ্য-ই পাওয়া যায় না। বরং Giant QR Code Generator -কথাটি দেখা যায়। অর্থাৎ ডিজিটালি ম্যানিপুলেট করে তৈরি করা হয়েছে অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের এই ‘ই-রিসিপ্ট’ বা মানি রিসিপ্ট।
আন্ডার রেটিং-ভুয়া পলিসি, বঞ্চিত সরকার
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা খাতে অনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হলো ‘আন্ডার রেটিং’ বা নির্ধারিত ট্যারিফের চেয়ে কম প্রিমিয়ামে পলিসি ইস্যু করা। ভুয়া মানি রিসিপ্ট মূলত এই আন্ডার রেটিং বা পলিসি গায়েব করার অপরাধ ঢাকতেই ব্যবহৃত হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, গ্রাহককে ট্যারিফ রেট অনুযায়ী বড় অঙ্কের মানি রিসিপ্ট ইস্যু করা হলেও কোম্পানির নিজস্ব সার্ভারে পলিসিটি অত্যন্ত নগণ্য প্রিমিয়াম দেখিয়ে আন্ডার রেট করে এন্ট্রি করা হয়। বাকি বড় অঙ্কের টাকা পকেটে পুরেছে অসাধু চক্রটি।
এর ফলে একদিকে গ্রাহক তার প্রকৃত ঝুঁকির বিপরীতে বীমা দাবি থেকে বঞ্চিত হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে রাষ্ট্র হারাচ্ছে বিপুল রাজস্ব। নথিতে ১৫% ভ্যাট এবং স্ট্যাম্প ডিউটির কথা উল্লেখ থাকলেও, আন্ডার রেটিং ও ভুয়া পলিসির কারণে এই ভ্যাট ও ট্যাক্সের টাকা কখনোই সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে না।
বীমা কোম্পানিগুলো যা বলছে
মানি রিসিপ্ট জালিয়াতি ও আইন লঙ্ঘনের বিষয়ে সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নুরুল আলম চৌধুরী বলেন, আলোচিত মানি রিসিপ্টটি জাল নয়; সঠিক। আমরা যাচাই করেছি, এই মানি রিসিপ্টে পলিসি ইস্যু হয়েছে এবং কোম্পানির ব্যাংক একাউন্টে প্রিমিয়ামের টাকা জমা হয়েছে। হয়তো আগের ছাপানো কিছু মানি রিসিপ্ট কারো কাছে ছিল, সেখান থেকে এটি ইস্যু করেছে; তবে এটা ঠিক হয়নি।
অবৈধ এই মানি রিসিপ্টে স্বাক্ষর প্রদানকারী সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্সের কর্মকর্তা ডিএমডি ও হেড অব ব্রাঞ্চ মো. আবদুল কাদেরও বিষয়টি স্বীকার করেছেন ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’র কাছে।
অগ্রণী ইন্স্যুরেন্সের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও এসইভিপি চিন্ময় চক্রবর্তী এ বিষয়ে বলেন, কোম্পানি থেকে কখনো জাল মানি রিসিপ্ট ইস্যু করে না। কারণ জাল মানি রিসিপ্টের কারণে কোম্পানি-ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বরং, এসব অপরাধীদের আমরা ধরার চেষ্টা করছি; কিন্তু পারছি না। কিছু কুচক্রি বীমা কর্মী ও ব্যাংক কর্মকর্তা যোগসাজসে এসব জাল মানি রিসিপ্ট তৈরি করে থাকে। বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলগুলোতে এই ভুয়া পলিসি ইস্যু বেশি হচ্ছে বলে আমাদের কাছে অভিযোগ আছে। এর আগেও আমাদের কাছে এমন অভিযোগ এসেছিল।
তবে কারা এসব জাল মানি রিসিপ্ট তৈরি করে এবং ব্যাংকে জমা দেয়, সেটা আমরা চিহ্নিত করতে পারিনি। কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা আমাদের সহযোগিতা করছে না। বিষয়টি নিয়ে বেশি চাপাচাপি করলে ব্যাংক থেকে আমাদের ব্যবসা দেয়া বন্ধ করে দিতে পারে। তবে বিষয়টি নিয়ে আমরা বিএফআইইউ’র কাছে অভিযোগ করেছি। ২০২৫ সালে এই অভিযোগ করা হলেও এখন পর্যন্ত সেখান থেকে তেমন কোন তৎপরতা দেখছি না।
মানি রিসিপ্ট জালিয়াতি, পদক্ষেপ নেবে আইডিআরএ
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)’র মুখপাত্র সাদিক আরমান বলেন, মানি রিসিপ্ট জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে কর্তৃপক্ষ। একইসঙ্গে গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বীমা পলিসি গ্রহণের সাথে সাথেই আইডিআরএ’র পোর্টালে তা ভেরিফাই করার পদ্ধতি আরো ব্যাপকভাবে প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হবে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।