সরকারি ও বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠান
কল্যাণ চক্রবর্তী: পাক-ভারত উপমহাদেশে বীমার জন্মলগ্ন থেকে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি বেসরকারিখাতে বীমা ব্যবসা করে আসছিল। দেশ বিভাগের পর এদেশে দেশি ও বিদেশি প্রায় ৭৫টি বীমা প্রতিষ্ঠান বীমা ব্যবসা করতো। ক্রমে বিদেশি কোম্পানিগুলো এদেশ থেকে তাদের বীমা ব্যবসা গুটাতে থাকে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এদেশের ৩৭টি বীমা কোম্পানিকে রাষ্ট্রায়াত্ত্ব করা হয়, আমেরিকান লাইফ ইনসিওরেন্স ব্যতিত। বেসরকারিখাত থেকে বীমা কোম্পানিগুলি সরকারিখাতে আনার পর দেখা গেল তারা তেমন কোন ভাল ফল করতে পারছে না। ফলে আবার ১৯৮৫ সালে বেসরকারিখাতে বীমা কোম্পানি গঠনের অনুমতি সরকার প্রদান করেন। বাংলাদেশে একযুগ কাল সম্পূর্ণ সরকারিখাতে বীমা ব্যবসা চলছিল। কিন্তু এই সময় বীমার বাজার প্রায় লুপ্ত হওয়ার উপক্রম হওয়ায় সরকার বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বীমা ব্যবসার সুযোগ দেয়। যার ফলে পুনরায় এদেশে বীমার একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি বা বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানের মূলত কোন পার্থক্য নাই। এদেশের সকল বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি বীমা নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আওতাভুক্ত। সব প্রতিষ্ঠানকে বীমা নিয়ন্ত্রকের নির্দেশমত বীমা আইন অনুযায়ী বীমা ব্যবসা করতে হয়। এখানে সরকারি বা বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানের জন্য আলাদা কোন নিয়ম নেই। সরকারি বলেন আর বেসরকারি বলেন কেউ বীমা আইন বহির্ভুত কোন কাজ করতে পারে না। তবে সেবার মানগত দিক দিয়ে বর্তমান বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠনগুলি দেশের জনসাধারণের আস্থাভাজন হয়েছে। তাছাড়া সরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানটি পুরাতন ও চিরাচরিত বীমা পরিকল্পনা ও সেবার পদ্ধতি পরিবর্তন করে তড়িৎ গ্রাহকসেবা প্রদানে সমর্থ না হওয়ায় জনসাধারণের আস্থা হারিয়েছে। যদিও তারা এখন তাদের লুপ্ত গৌরব পুনঃরুদ্ধারের চেষ্টা চালাচ্ছে।
অন্যদিকে বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানগুলি আধুনিক বীমা পরিকল্পনা রচনা করে বা তড়িৎ সেবা প্রদান করে জনগণের চাহিদানুযায়ী বীমাকে যুগোপযোগী করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। তাই মানুষ এখন জীবন বীমার তড়িৎ সেবা পাওয়ার জন্য সরকারি নয় বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানের দিকে অধিক মনোযোগী হয়েছে। শুধু বীমা নয় দেশের সমস্ত ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলি জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে এবং তারা নিজেরাও প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তার পিছনে যে কারণটি রয়েছে তাহলো পরিচালনাগত দক্ষতা এবং নিয়ন্ত্রণ। যে প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড পরিচালকদের কাছে যত নিয়ন্ত্রিত সেখানে পরিকল্পনামাফিক উৎপাদন হবে এবং সে প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি ততো তাড়াতাড়ি শক্ত হবে। আমাদের দেশে এখন কোন হঠকারিতার সময় নয়। এখন শুধু দেশ গড়ার জন্য কাজ করার সময়। আর এই কঠিন দায়িত্বটি কোন প্রতিষ্ঠানগুলি করতে পারছে তা জনসাধারণ উপলব্ধি করছে এবং তাদের সেবার সান্নিধ্যে আসার চেষ্টা করছে। তাই সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কেন, আসুন এক সাথে সবার জন্যে যে নিয়ম তা মেনে চলি এবং সম্মিলিতভাবে দেশ গড়ি। যে যে প্রতিষ্ঠানে আছি সে সে প্রতিষ্ঠানকে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলি।
কিন্তু কিছু কিছু ব্যক্তি আছে যারা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে বাজি ধরেন। আসলে নিয়ম ও নীতি সবার জন্য এক। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় সরকারি ও বেসরকারি স্কুলের প্রশ্নপত্র এক, আবার রাস্তায় ট্রাফিক সিগন্যলে যখন লাল বাতি জ্বলে তখন সরকারি পরিবহন ও বেসরকারি পরিবহনের জন্য আলাদা কোন নিয়ম থাকে না, সবাইকে সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। আইন সবার জন্য সমান। আমার একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। একটি বীমা করতে গিয়ে খুলনা শহরের একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং আমি যে বাসায় ভাড়া থাকি সেই বাড়ির মালিক, একদিন বাসার ছাদে বসে এই প্রসঙ্গে কথা উঠলো। তিনি সরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানে বিশ্বাসী এবং বেসরকারি বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থাশীল নন। আমি তার কথাগুলি খুব মন দিয়ে শুনলাম। পরে তাকে পর পর কিছু প্রশ্ন করতে লাগলাম খুব সহাস্য মুখে, তার স্ত্রীও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমি জানতাম তার দুই দিন আগে তিনি ঢাকা গিয়েছিলেন খালেক এন্টারপ্রাইজে এবং এসেছিলেনও একই গাড়ীতে।
আমি প্রশ্ন করলাম বিআরটিসি গাড়ী থাকতে আপনি খালেক এন্টরপ্রাইজে ঢাকা গেলেন কেন? খুলনা শহরে অজস্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। কিন্তু আপনার ছেলেকে গ্রীন বার্ডস ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করলেন কেন? ভাবী অসুস্থ হলে খুলনা সদর হাসপাতালে না নিয়ে খুলনার অত্যাধুনিক বেসরকারি হাসপাতাল গরীব নেওয়াজে নিলেন কেন? ভদ্র লোক আমার একটি প্রশ্নেরও জবাব দিলেন না। পরদিন সকালে আমার অফিসে গিয়ে দুই লক্ষ টাকার একটি পলিসি নিলেন এবং ঐ পলিসিতে পুরো পরিবারের হাসপাতাল বীমা যুক্ত করলেন। অতএব সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান নিয়ে ঝগড়া না করে আদর্শগত ও সেবাগত মান নিয়ে যুক্তিতর্ক দিবেন। দেখবেন মানুষ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দিকে আকৃষ্ট হবে।
লেখক: সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে কোম্পানি লিমিটেড’র এডিশনাল ম্যানেজিং ডাইরেক্টর অ্যান্ড সিএফও।
প্রকাশের তারিখ- ১৯ জানুয়ারি, ২০১৭