ফারইস্ট ইসলামী লাইফের তথ্য পাচার: গ্রাহক হয়রানি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ৫৫ হাজার ৮৬ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত ও গোপনীয় তথ্য পাচারের জেরে গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি এবং প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে। হয়রানির শিকার হয়ে বাবুল প্রধান এবং মুহাম্মদ তাওহীদুল ইসলাম নামের দুজন গ্রাহকের পক্ষ থেকে গত ৩ ও ১১ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিটির কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা জানিয়েছেন, প্রতারক চক্র ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। এরপর সুকৌশলে ব্যাংক কার্ডের তথ্য সংগ্রহ করে অর্থ আত্মসাৎ করছে।

এর আগে ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট তথ্য পাচারের এই ঘটনায় কোম্পানিটির সাবেক মুখ্য নির্বাহী এবং আইডিআরএ’র বর্তমান সদস্য (লাইফ) আপেল মাহমুদসহ তিনজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ।

কোম্পানিটির আইন কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন শাহবাগ থানায় বাদী হয়ে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫ এর ১৯, ২১ ও ২২ নং ধারায় এই মামলা করেন। মামলা নং- ৯। মামলার অন্য আসামিরা হলেন- কোম্পানিটির আইটি বিভাগের ইনচার্জ লোকমান ফারুক ও এসিসট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট ওসমান গণি।

এজাহারে উল্লেখ করা হয়, আসামিরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে কোম্পানির ডিজিটাল ডিভাইসে অবৈধভাবে প্রবেশ করে এই বিপুল পরিমাণ তথ্য সাবলাইন লিমিটেডের কাছে সরবরাহ করেন।

তথ্য ফাঁসের নেপথ্য ও সংশ্লিষ্টতা:

জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৭ মে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র, ব্যাংক হিসাব, মোবাইল নম্বর, বেতন-ভাতা এবং পরিচিতি নম্বরসহ বিভিন্ন সংবেদনশীল তথ্য পাচার করা হয়।

এসব তথ্য 'সাবলাইন লিমিটেড' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটির মালিক জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে হত্যা মামলায় আটক হওয়া প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদ।

তিনি সে সময় বেক্সিমকো গ্রুপের মনোনয়নে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের স্বতন্ত্র পরিচালক এবং এনআরসি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। শেখ মামুন খালেদের নির্দেশেই এসব তথ্য হস্তান্তর করা হয়েছিল বলে জানিয়েছেন কোম্পানির সাবেক মুখ্য নির্বাহী আপেল মাহমুদ।

প্রায় ২০ শতাংশ শেয়ার কিনে ফারইস্ট ইসলামী লাইফের মালিকানায় আসে বেক্সিমকো গ্রুপের দুই প্রতিষ্ঠান জুপিটার বিজনেস লিমিটেড এবং ট্রেডনেক্সট ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। প্রতিষ্ঠান দু’টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে ২০২২ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি বীমা কোম্পানিটির পর্ষদ পুনর্গঠন করে বিএসইসি।

এর আগে ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ অপসারণ করে নতুন ১০ জন স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগ করে বিএসইসি। কোম্পানিটির ২১০০ কোটি টাকার বেশি লোপাটের তথ্য নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে আসার পর বিনিয়োগকারী, পলিসিহোল্ডার এবং সামগ্রিক পুঁজিবাজারের সুরক্ষার জন্য এই সিদ্ধান্ত নেয় বিএসইসি।

উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ রাতে রাজধানীর মিরপুরের ডিওএইচএসের বাসা থেকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) শেখ মামুন খালেদকে আটক করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকালে রাজধানীর মিরপুরে দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় তার পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

অভিযোগের বিষয়ে যা বলছেন ভুক্তভোগী গ্রাহক

অভিযোগের বিষয়ে বীমা গ্রাহক বাবুল প্রধান ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি’কে জানান, ফারইস্ট ইসলামী লাইফের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একজন তাকে ফোন করেন এবং বীমার টাকা প্রদানের জন্য তার এটিএম কার্ডের ফটোকপি চান। তবে তিনি ব্যাংক একাউন্ট নম্বর পাঠাতে চাইলে ফোনকারী তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে জানান। বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হলে বাবুল প্রধান ঢাকাস্থ তার ভাইকে জানান এবং এ বিষয়ে বীমা কোম্পানিতে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।

তথ্য পাচার ও গ্রাহকদের অভিযোগের বিষয়ে জানতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবদুর রহিম ভুঁইয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য নেয়া সম্ভব হয়নি।