আইডিআরএ’র নতুন সিদ্ধান্তে নন-লাইফে ব্যবসা উন্নয়ন কর্মীদের প্রশিক্ষণ বাধ্যবাধকতা নিয়ে অনিশ্চয়তা

এ কে এম এহসানুল হক, এফসিআইআই: বাংলাদেশের বীমা খাতে প্রশিক্ষণকে শুধু দক্ষতা বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা হিসেবে নয়, বরং গ্রাহক সুরক্ষা, বাজারে স্বচ্ছতা এবং খাতের টেকসই উন্নয়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশেষ করে ব্যবসা উন্নয়ন বা বিক্রয় কার্যক্রমে যুক্ত কর্মীদের ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের গুরুত্ব আরও বেশি, কারণ এই কর্মীরাই বীমা পণ্যের জটিল শর্তাবলি সরাসরি গ্রাহকের কাছে ব্যাখ্যা করেন, পলিসি বিক্রয়ের সিদ্ধান্তে গ্রাহককে প্রভাবিত করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিক্রয়-পরবর্তী সেবার প্রাথমিক যোগাযোগের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তাদের দক্ষতা ও আচরণগত মান কেবল কোম্পানির ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, পুরো খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
এই বাস্তবতা মাথায় রেখে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এর আগে জীবন ও সাধারণ উভয় শ্রেণির বীমা কোম্পানির আর্থিক সহযোগী ও বিক্রয় এজেন্টদের জন্য প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করেছিল। সাধারণ বীমা খাতে কমিশনভিত্তিক আর্থিক সহযোগীদের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু থাকা এক ধরনের মান নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা পালন করেছে। এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিক্রয়কর্মীদের ন্যূনতম জ্ঞান ও দায়িত্ববোধ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, যা বাজারে ভুল তথ্য, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি এবং গ্রাহক বিভ্রান্তির মতো ঝুঁকি কমাতে সহায়ক হয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে আইডিআরএ এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা বীমা কোম্পানিগুলোর বিক্রয় ও ব্যবসা উন্নয়ন কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনতে পারে। কর্তৃপক্ষ কমিশনভিত্তিক অংশকালীন আর্থিক সহযোগী বা বিক্রয় এজেন্ট ব্যবস্থাকে কার্যত অপ্রাসঙ্গিক ঘোষণা করেছে এবং নির্দেশ দিয়েছে যে তারা স্থায়ী কর্মীর আওতায় আসবেন। অর্থাৎ আগে যে কর্মীবাহিনী অনেকাংশে খণ্ডকালীন ও কমিশন নির্ভর কাঠামোর মধ্যে কাজ করত, তা এখন স্থায়ীকরণের দিকে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্তকে একদিকে পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এটি বিদ্যমান প্রশিক্ষণ কাঠামো ও বাধ্যবাধকতায় নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
নতুন পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবসা উন্নয়ন কর্মীদের প্রশিক্ষণ বিষয়ে। পূর্বে যে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক ছিল, তা মূলত আর্থিক সহযোগী বা কমিশনভিত্তিক বিক্রয় এজেন্টদের লক্ষ্য করে প্রণীত ছিল। এখন যখন ওই কাঠামো পরিবর্তিত হয়ে স্থায়ী কর্মীভিত্তিক ব্যবস্থায় রূপ নিচ্ছে, তখন প্রশিক্ষণের বিধানটি ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় এবং কোন পরিধিতে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা না এলে কোম্পানিগুলো কেউ কঠোর প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাবে, কেউ আবার বাধ্যতামূলকতা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে কার্যক্রম দুর্বল করতে পারে। ফলে বাজারে মান নিয়ন্ত্রণের ধারাবাহিকতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, কাঠামো পরিবর্তিত হলেও প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা একটুও কমে না, বরং আরও বাস্তবধর্মী এবং কঠোরভাবে প্রশিক্ষণ বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হয়। স্থায়ী কর্মী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হলে ব্যবসা উন্নয়ন কর্মীদের ভূমিকা কেবল বিক্রয়কেন্দ্রিক থাকবে না, বরং গ্রাহকের চাহিদা বোঝা, ঝুঁকি মূল্যায়ন, যথাযথ পণ্য নির্বাচন, নথি যাচাই এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এসব দায়িত্ব পালনে পলিসি কাঠামো, দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া, নৈতিক বিক্রয় পদ্ধতি, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা এবং গ্রাহক সেবা- সব বিষয়ে সুস্পষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা জরুরি। প্রশিক্ষণ না থাকলে ভুল ব্যাখ্যা, ভুল প্রতিশ্রুতি বা প্রক্রিয়াগত ত্রুটি বাড়তে পারে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের আর্থিক নিরাপত্তা ও বীমা খাতের বিশ্বাসযোগ্যতা- উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।
বীমা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশ মনে করছে, কমিশনভিত্তিক অংশকালীন বিক্রয় ব্যবস্থার পরিবর্তে স্থায়ী কর্মীভিত্তিক কাঠামো গড়ে উঠলে বিক্রয় প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলা, পেশাদার আচরণ এবং প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা বাড়বে। কিন্তু এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণকে নীতিগতভাবে আরও গুরুত্ব দিতে হবে এবং সেটি বাস্তবে বাস্তবায়নযোগ্য ও একরূপ হতে হবে। প্রশিক্ষণ যদি স্পষ্টভাবে বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত না হয়, তাহলে কাঠামোগত পরিবর্তন সত্ত্বেও গ্রাহক বিভ্রান্তি, অভিযোগ বৃদ্ধি এবং বাজারে অনাস্থার প্রবণতা থেকে যেতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে আইডিআরএ’র কাছে একটি স্পষ্টীকরণ জরুরি হয়ে উঠেছে যে- নন-লাইফ বীমা কোম্পানির ব্যবসা উন্নয়ন কর্মীদের প্রশিক্ষণ কি বাধ্যতামূলক থাকবে, থাকলে কোন নির্দেশনা অনুযায়ী তা পরিচালিত হবে, এবং স্থায়ী কর্মীভুক্ত বিক্রয় জনবলকে কীভাবে প্রশিক্ষণ কাঠামোর আওতায় আনা হবে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত একটি পরিপত্র বা পরিষ্কার নির্দেশনা জারি হলে এই বিষয়ে বিভ্রান্তি দূর হবে, কোম্পানিগুলো প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারবে এবং একই সঙ্গে বাজারের মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া আরও কার্যকর হবে।




