ডিরেক্ট চ্যানেল নাকি ব্রোকার? বড় ঝুঁকিতে কাকে ভরসা করবেন

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের অর্থনীতি যখন উৎপাদন, রপ্তানি, অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবহন এবং ডিজিটাল ব্যবসার দিকে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, তখন ঝুঁকিও একই সঙ্গে বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। আগুন, দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সাপ্লাই চেইন বিঘ্ন, পণ্য পরিবহনে ক্ষতি, শ্রমিক নিরাপত্তা, আর্থিক অনিয়ম ও সাইবার অপরাধ- সব মিলিয়ে ব্যবসার ঝুঁকি এখন আর একক কোনো সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এই বাস্তবতায় বীমা কেবল নীতিগত বাধ্যবাধকতা বা একটি কাগুজে নিশ্চয়তা নয়; এটি হয়ে উঠেছে ব্যবসার ধারাবাহিকতা, মূলধন সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য একটি কৌশল।
তবে বীমা নেয়ার মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যবসা ও ব্যক্তিগত গ্রাহকদের সামনে দাঁড়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তা হলো- ইন্স্যুরেন্স ব্রোকারের মাধ্যমে পলিসি নেয়া ভালো, নাকি সরাসরি কোনো বীমা কোম্পানির কাছ থেকে পলিসি কিনে নেয়াই বেশি কার্যকর? এই সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে শুধু প্রিমিয়ামের পার্থক্য নয়; এটি নির্ধারণ করে দেয় ঝুঁকির বাস্তবতার সঙ্গে পলিসির মিল কতটা গভীর হবে, ক্ষতির সময় দাবি নিষ্পত্তি কতটা সহজ হবে এবং গ্রাহক কতটা সহায়তা পাবেন।
বাংলাদেশের বীমা বাজারে গত কয়েক বছরে ডিজিটাল যোগাযোগ, দ্রুত কোটেশন এবং অনলাইন সুবিধার বিস্তার দেখা গেছে। ফলে অনেকেই সরাসরি বীমা কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে পলিসি নেয়ার পথে এগোচ্ছেন। আবার একই সময়ে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গার্মেন্টস, নির্মাণ, আমদানি-রপ্তানি, লজিস্টিকস ও আর্থিক খাতে- যেখানে ঝুঁকির ধরন জটিল এবং ক্ষতির প্রভাব ব্যাপক- সেখানে ব্রোকার-নির্ভরতা কমছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে ব্রোকারের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, কারণ তারা কেবল পলিসি দেখিয়ে দেন না; তারা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে কাভারেজের কাঠামো তৈরি করে দেন।
ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার মূলত গ্রাহক ও বীমা কোম্পানির মাঝখানে কাজ করলেও তার মূল দায়বদ্ধতা থাকে গ্রাহকের দিকে। ব্রোকাররা ব্যবসার প্রকৃতি, সম্পদের ধরন, অপারেশনের দুর্বলতা, পূর্বের দুর্ঘটনা কিংবা ক্ষতির ইতিহাস এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনা করে কাভারেজের প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণ করেন। এরপর তারা বাজারের বিভিন্ন বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব তুলনা করে গ্রাহকের জন্য উপযোগী পলিসি নির্বাচন করেন এবং অনেক ক্ষেত্রেই শর্তাবলী, এক্সক্লুশন, দায়বদ্ধতার সীমা ও ডিডাক্টিবল নিয়ে দরকষাকষিতে সহায়তা দেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ক্ষতির সময় ক্লেইম প্রক্রিয়ায় ব্রোকারের সহায়তা অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের জন্য পার্থক্য গড়ে দেয়- দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি হবে কি হবে না, ক্ষতিপূরণ ন্যায্য হবে কি হবে না- এটা অনেকটা নির্ভর করে ক্লেইম কীভাবে তৈরি ও উপস্থাপন করা হলো তার ওপর।
বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক বাস্তবতায় এই ভূমিকা বিশেষভাবে জরুরি। গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল খাতে অগ্নিকাণ্ড ও যন্ত্রপাতি বিকল হওয়ার মতো ঝুঁকি শুধু সম্পদের ক্ষতি নয়; এটি উৎপাদন বন্ধ, ডেলিভারি দেরি, বিদেশি ক্রেতার জরিমানা এবং চুক্তি বাতিলের মতো ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি করতে পারে। একটি স্ট্যান্ডার্ড ফায়ার পলিসি থাকলেই যে বাস্তব ক্ষতি কাভার হবে তা নয়। অনেক সময় স্টক ভ্যালুয়েশন, ব্যবসা বন্ধের ক্ষতি, মেশিনারির ক্ষতি বা ইলেকট্রিক্যাল ব্রেকডাউন- এসব আলাদা কাভারেজ প্রয়োজন। ব্রোকাররা সাধারণত এই ধরনের ঝুঁকিকে একসঙ্গে বিবেচনা করে এমন প্যাকেজ সাজাতে পারেন, যেখানে ব্যবসা শুধু ক্ষতিপূরণ পায় না, বরং দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যও সহায়তা পায়। সরাসরি পলিসি কেনার ক্ষেত্রে অনেক গ্রাহক কাগজে ‘কাভারেজ আছে’ ধরে নেন, কিন্তু ক্ষতির পর শর্তাবলীর ব্যতিক্রম বা অপর্যাপ্ত সীমার কারণে বাস্তবে কাভারেজ কমে যায়- এটাই বাংলাদেশের বাজারে সবচেয়ে পরিচিত অভিযোগগুলোর একটি।
বাংলাদেশে লজিস্টিকস, রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফ্রেইট ও কার্গো ইন্স্যুরেন্সের গুরুত্বও দ্রুত বেড়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর-কেন্দ্রিক পরিবহন, স্থলবন্দর, নদীপথ ও সড়কপথ- সবক্ষেত্রে ঝুঁকি ভিন্ন। কোথাও পণ্য ভিজে নষ্ট হয়, কোথাও চুরি হয়, কোথাও লোডিং-আনলোডিংয়ে ড্যামেজ হয়, কোথাও ট্রানজিটে দুর্ঘটনা ঘটে। ফ্রেইট ইন্স্যুরেন্সে কাভারেজ নির্ভর করে পণ্যের ধরন, প্যাকিং মান, পরিবহনের রুট এবং শিপিং ডকুমেন্টের ওপর। এখানে ভুল শর্ত কিংবা অস্পষ্ট কাভারেজ মানে ক্ষতির সময় দাবি আটকে যাওয়া। ব্রোকাররা সাধারণত এই খাতে নির্দিষ্ট চালান বা ব্যবসার ধরন অনুযায়ী কাভারেজ সাজিয়ে দেন এবং ডকুমেন্টেশন থেকে দাবি উপস্থাপন পর্যন্ত সহযোগিতা করেন। সরাসরি বীমা কোম্পানি সাধারণ কাভারেজ দিতে পারে, কিন্তু পণ্য ও রুটের বৈচিত্র্য অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নমনীয়তা অনেক সময় সীমিত থাকে- এটাই বাস্তবতা।
অন্যদিকে আর্থিক অনিয়ম এবং প্রতারণাজনিত ক্ষতি- বাংলাদেশের করপোরেট ও এসএমই খাতে ক্রমেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। কর্মচারীর অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া ভাউচার, ইনভেন্টরি জালিয়াতি, পেমেন্ট ম্যানিপুলেশন, ডিজিটাল ফ্রড বা সাইবার হামলা- এ ধরনের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই কাভারেজ সাধারণত শর্তনির্ভর এবং প্রমাণভিত্তিক। ফলে কাভারেজ সঠিকভাবে ডিজাইন না হলে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে পলিসির শর্ত না মিললে ক্লেইম নিষ্পত্তি কঠিন হয়ে যায়। এখানে ব্রোকাররা কেবল বীমা করিয়ে দেন না; তারা প্রতিষ্ঠানকে ঝুঁকি কমানোর দিকনির্দেশও দেন, যাতে পলিসি কার্যকর হয় এবং ক্লেইম গ্রহণযোগ্য হয়। এটি বাংলাদেশের মতো বাজারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তোলার পথে আছে।
তবে ডিরেক্ট ইন্স্যুরেন্সের শক্তিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের অনেক ব্যক্তি গ্রাহক, ছোট ব্যবসা এবং কম ঝুঁকির প্রতিষ্ঠান এমন কাভারেজ চান যা দ্রুত, সহজ এবং কম সময়ে সম্পন্ন হয়। এই ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির ডিরেক্ট সেবা, দ্রুত কোটেশন, রিনিউয়াল সুবিধা এবং সাধারণ কাভারেজ প্যাকেজ অনেকের কাছে সুবিধাজনক। বিশেষ করে যেখানে চাহিদা স্ট্যান্ডার্ড- যেমন গাড়ি, মোটরসাইকেল, সাধারণ অগ্নি ঝুঁকি বা বেসিক স্বাস্থ্য কাভারেজ- সেখানে সরাসরি পথ গ্রহণযোগ্য এবং অনেক সময় কার্যকরও হতে পারে। এছাড়া অনেক গ্রাহক চান নিজেই নিয়ন্ত্রণ রাখতে- ডকুমেন্ট, প্রিমিয়াম, রিনিউয়াল, ক্লেইম ট্র্যাকিং- এসব নিজে পরিচালনার সুবিধাও ডিরেক্ট মডেল দেয়।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ডিরেক্ট ইন্স্যুরেন্সের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো ঝুঁকি বিশ্লেষণের ঘাটতি এবং পলিসি বোঝার জটিলতা। কারণ সাধারণ গ্রাহক অনেক সময় কাভারেজের ভাষা, এক্সক্লুশন, শর্তের সূক্ষ্মতা বা ক্লেইমের প্রয়োজনীয়তা বুঝে উঠতে পারেন না। ফলে সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় দ্রুততা ও কম প্রিমিয়াম গুরুত্বপূর্ণ মনে হলেও, প্রকৃত পরীক্ষাটি আসে ক্ষতির সময়। তখন দেখা যায়, পলিসি আছে ঠিকই- কিন্তু ক্ষতির ধরনটি কাভার নয়, অথবা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট না থাকায় দাবি গ্রহণ করা যাচ্ছে না, অথবা ক্ষতিপূরণ প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কম। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশে নতুন নয় এবং এ কারণেই অনেক প্রতিষ্ঠান এখন বীমা কেনার সময় শুধু খরচ নয়, ‘ক্লেইম সক্ষমতা’কেও সমান গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে।
বীমা বাজারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা বলছে, বাংলাদেশেও একটি মিশ্র বাস্তবতা গড়ে উঠবে। একদিকে বীমা কোম্পানিগুলো ডিজিটাল সেবা আরও শক্তিশালী করবে এবং সরাসরি মডেল আরও জনপ্রিয় হবে। অন্যদিকে উচ্চ ঝুঁকি ও বিশেষায়িত কাভারেজে ব্রোকারদের পরামর্শভিত্তিক সেবার চাহিদা থাকবে, কারণ এই খাতে কেবল পলিসি কেনাই যথেষ্ট নয়- পলিসিকে ঝুঁকির সঙ্গে সঠিকভাবে মিলিয়ে নেয়াই আসল কাজ। ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতার কেন্দ্র হবে সেবা ও সক্ষমতা। ব্রোকাররা প্রযুক্তি-ভিত্তিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং দ্রুত পরিষেবার দিকে আরও মনোযোগ দেবে, আর বীমা কোম্পানিগুলো ডিরেক্ট চ্যানেলে আরও উন্নত আন্ডাররাইটিং এবং জটিল ক্লেইম ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী সহায়তা যোগ করতে বাধ্য হবে।
বাংলাদেশের যে প্রতিষ্ঠানগুলো জটিল ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে, যাদের ব্যবসা বড় সম্পদ, সাপ্লাই চেইন এবং আন্তর্জাতিক চুক্তির সঙ্গে জড়িত, তাদের জন্য ব্রোকারের মাধ্যমে বীমা নেয়া প্রায়ই নিরাপদ ও বাস্তবসম্মত পথ। কারণ এখানে কাভারেজের সূক্ষ্মতা এবং ক্লেইমের সক্ষমতা ব্যবসার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে। আর যাদের চাহিদা তুলনামূলক সহজ এবং যারা দ্রুত ও স্ব-পরিচালিত সমাধান চান, তাদের জন্য ডিরেক্ট ইন্স্যুরেন্স কার্যকর বিকল্প হতে পারে।




