বাংলাদেশের বীমা খাতের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ড. বিশ্বজিৎ কুমার মন্ডল: বাংলাদেশের বীমা খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারমূলক আর্থিক খাত হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে সুশাসনের সংকট, নিম্ন পেনিট্রেশনের হার এবং জনগণের আস্থার অভাবের মতো নানাবিধ জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান সরকার এবং বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রেগুলেটরি অথরিটি (আইডিআরএ) এই খাতের আমূল সংস্কারের জন্য একটি উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, যা এই খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে বিশ্বাস। নিম্নে এই খাতের বর্তমান অবস্থা, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা এবং একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

বর্তমান অবস্থা: সংকট ও সংস্কারের দ্বৈত চিত্র

বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে এক অনন্য ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে যেমন সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি এবং দুর্বল নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর কারণে এই খাত চরম আস্থাহীনতায় ভুগছে, অন্যদিকে আইডিআরএ এই খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য বেশ কিছু কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

বাজার পেনিট্রেশন ও আকারের চিত্র

বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় বীমা খাতের অবদান (ইন্স্যুরেন্স পেনিট্রেশন) অত্যন্ত নগণ্য, যা মাত্র ০.৩০% থেকে ০.৫০% এর মধ্যে অবস্থান করছে। ২০১০ সালে এই হার ছিল প্রায় ০.৯০% । অথচ এই খাতে ৮২টি কোম্পানি (৩৬টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ বীমা) সক্রিয় রয়েছে, যা ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো বিশাল অর্থনীতির (ভারতে ৫৮টি, পাকিস্তানে ৪০টি ও শ্রীলঙ্কায় ১৮টি কোম্পানি) তুলনায় অনেক বেশি ।

বাংলাদেশে বীমা খাতের চিত্র তুলনামূলকভাবে দুর্বল। দেশে বীমা পেনিট্রেশন জিডিপির মাত্র ০.৩০%-০.৫০%, যেখানে আঞ্চলিক প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ভারতে এটি ৩.৭%-৪.২%, নেপালে ৩.৭২% এবং পাকিস্তানে ০.৬০%। বাংলাদেশে বীমা কোম্পানির সংখ্যা ৮২টি (৩৬টি জীবন বীমা ও ৪৬টি সাধারণ বীমা), যা ভারতের ৫৮টি, পাকিস্তানের ৪০টি এবং শ্রীলঙ্কার ২৮টি কোম্পানির তুলনায় বেশি হলেও কার্যকারিতার দিক থেকে চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। দাবি পরিশোধের হারও তুলনামূলকভাবে কম, জীবন বীমায় ৩৪% এবং সাধারণ বীমায় মাত্র ১০%, যা উদ্বেগজনকভাবে নিম্ন। এছাড়া ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ২৬ লক্ষেরও বেশি পলিসি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে তামাদি হয়েছে, যা বীমা খাতে আস্থার বড় সংকটের ইঙ্গিত দেয়।

মূল চ্যালেঞ্জসমূহ

সুশাসন ও স্বচ্ছতার অভাব: দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার অভাবে এই খাত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ, প্রাইম ইসলামী লাইফ, পদ্মা ইসলামী লাইফ, সান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো কোম্পানি পলিসিহোল্ডারদের তহবিল থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে । আইডিআরএ-র বর্তমানে কোনো বীমা কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়ার ক্ষমতা বীমা আইন ২০১০ এ সরাসরি না থাকায় দুর্বল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব হচ্ছে না ।

অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা: অর্থনীতির আকারের তুলনায় কোম্পানির সংখ্যা অত্যধিক হওয়ায় বাজারে তীব্র ও অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, কোম্পানিগুলো ৪০% থেকে ৭০% পর্যন্ত অস্বাভাবিক হারে কমিশন দিয়ে ব্যবসা সংগ্রহের চেষ্টা করছে, যা তাদের দাবি পরিশোধের সক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে ।

দাবি পরিশোধে অনীহা ও ধীরগতি: বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে গ্রাহকদের বৈধ দাবি পরিশোধে অনীহার ব্যাপক অভিযোগ আছে। রাষ্ট্রায়ত্ত পুনর্বীমাকারী প্রতিষ্ঠান সাধারণ বীমা কর্পোরেশন (এসবিসি)-এর দাবি নিষ্পত্তিতেও চরম ধীরগতি লক্ষণীয়, যেখানে ২০২১ সালের ফাইল ২০২৬ সালে প্রক্রিয়াকরণ করা হচ্ছে ।

পুনর্বীমা খাতে জটিলতা: সাধারণ বীমা খাতে ৫০% ব্যবসা এসবিসি-তে বাধ্যতামূলকভাবে সংরক্ষণের নিয়ম থাকায় একটি দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা তৈরি হয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম না দেওয়ার অজুহাতে এসবিসি দাবি নিষ্পত্তি করছে না, আর এসবিসি দাবি নিষ্পত্তি না করায় কোম্পানিগুলো প্রিমিয়াম দিচ্ছে না—এমন এক ঘূর্ণাবর্তে আটকে আছে খাতটি ।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: সংস্কারের মাধ্যমে নতুন দিগন্ত

বর্তমান সরকার ও আইডিআরএ খাতটির দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা সমাধানে যে উচ্চাভিলাষী সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে, তার ওপরই এই খাতের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনেকাংশে নির্ভর করছে ।

আইন ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সংস্কার:

বর্তমান তিনটি আইন (বীমা আইন -২০১০, নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ আইন -২০১০, ইন্সুরেন্স কর্পোরেশন আইন 2019) সংশোধন এবং তিনটি নতুন আইন (বীমা রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ-2025, বীমা আইন -২০১০, Actuaries Act ও Chartered Insurance Institute Act) প্রণয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে । প্রস্তাবিত বীমা রেজ্যুলেশন অধ্যাদেশ-2025 এর মাধ্যমে দুর্বল বীমা কোম্পানিকে একীভূতকরণ, পুনর্গঠন বা বন্ধ করে দেয়ার ক্ষমতা আইডিআরএ-কে দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যা খাতকে স্থিতিশীল করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আইডিআরএ-কে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষমতা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা সুশাসন নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পুনর্বীমা বাজার উদারীকরণ:

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ সাধারণ বীমা খাতে ৫০% ব্যবসা সাধারণ বীমা কর্পোরেশনে সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা তুলে নিতে সম্মত হয়েছে । এর ফলে বীমা কোম্পানিগুলো এখন আন্তর্জাতিক বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পুনর্বীমা সংগ্রহ করতে পারবে, যা তাদের দাবি পরিশোধের সক্ষমতা বাড়াবে এবং খাতের সামগ্রিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করবে ।

নতুন পণ্য উদ্ভাবন ও বাজার সম্প্রসারণ:

স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি ও ভ্রমণ বীমার মতো বৈচিত্র্যময় পণ্য উদ্ভাবনের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, যা বর্তমানে উপেক্ষিত । জনগণের মধ্যে আর্থিক সুরক্ষা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইডিআরএ কর্তৃক ন্যাশনাল কোর ইন্স্যুরেন্স সলিউশনের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করার মাধ্যমে বীমার পরিধি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।

পেশাদার সক্ষমতা বৃদ্ধি:

বর্তমানে দেশে মাত্র ২-৩ জন অ্যাকচুয়ারি রয়েছেন, যা এই খাতের জন্য একেবারেই নগণ্য। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ , অ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম চালু করার মাধ্যমে এই পেশাদার সংকট মোকাবিলার উদ্যোগ নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক মানের ঝুঁকি মূল্যায়ন ও সঠিক প্রিমিয়াম নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। কিন্তু তাতেও তেমন কোনো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।

তুলনামূলক বিশ্লেষণ:

বাংলাদেশের বীমা খাত কেবল উন্নত দেশগুলোর নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

আকার ও গভীরতা:

ভারতের বীমা খাতের অনুপ্রবেশ হার (৩.৭%) বাংলাদেশের (০.৪০%) তুলনায় প্রায় ৯ গুণ বেশি, আর নেপালও (৩.৭২%) অনেক এগিয়ে । এই বৈষম্যের মূল কারণ হলো গ্রাহকদের আস্থার অভাব এবং পণ্যের সীমিত পরিধি।

নিয়ন্ত্রণ কাঠামো:

ভারতে আইআরডিএআই-এর বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশে আইডিআরএ-র সেই ক্ষমতা নেই, যা প্রস্তাবিত সংস্কার আইনে অন্তর্ভুক্তের প্রস্তাব করা হয়েছে ।

কোম্পানির সংখ্যা:

বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও চাহিদার তুলনায় বীমা কোম্পানির সংখ্যা (৮২) অত্যধিক, যেখানে অনেক বড় অর্থনীতি ভারতেও কোম্পানির সংখ্যা (৫৮) কম । এই অতিরিক্ত সংখ্যাই অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা এবং নিম্নমানের সেবার মূল কারণ।

উদ্ভাবন ও বৈচিত্র্য:

ভারত ও শ্রীলঙ্কায় স্বাস্থ্য, কৃষি ও পেনশন বীমাসহ বিভিন্ন আধুনিক বীমা পণ্য প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশে পণ্যের বৈচিত্র্য এখনও সীমিত, যা বাজার সম্প্রসারণে বড় অন্তরায় ।

বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে সুশাসনের সংকট, নিম্ন পেনিট্রেশন ও আস্থার অভাবের মতো চরম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে। তবে, আইডিআরএ-র গৃহীত আইনগত ও কাঠামোগত সংস্কার উদ্যোগ, বিশেষ করে পুনর্বীমা বাজার উদারীকরণ, আইডিআরএ-কে শক্তিশালীকরণ এবং নতুন পণ্য উদ্ভাবনের সম্ভাবনা, এই খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের বীমা খাত পিছিয়ে থাকলেও, সঠিক সংস্কার বাস্তবায়ন, সুশাসন নিশ্চিতকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই খাত কেবল তার সত্যিকারের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারবে না, বরং জাতীয় অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। সংস্কারের এই যাত্রা সফল হলে আগামী দশকে বাংলাদেশের বীমা খাত একটি স্বাস্থ্যকর, প্রতিযোগিতামূলক ও গ্রাহকবান্ধব খাত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।