সংযুক্ত আরব আমিরাতে এখন সবার জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা, প্রবাসীদের জন্য কী বদলাচ্ছে?

প্রকাশিত: ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৬:২৫ পিএম

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বেসরকারি হাসপাতালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ভর্তি হতে হলো। কয়েকদিনের চিকিৎসা শেষে বিল এলো কয়েক হাজার দিরহাম। বড় ধরনের অস্ত্রোপচার বা জটিল রোগের চিকিৎসা হলে সেই ব্যয় আরও অনেক বেশি হতে পারে। স্বাস্থ্য বীমা না থাকলে পুরো অর্থই নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হয়।

এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা থাকলেও চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অসুস্থ হওয়া অনেক প্রবাসীর জন্য দীর্ঘদিন ধরেই বড় আর্থিক ঝুঁকি ছিল। চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়ে কেউ হাসপাতালে যেতে দেরি করতেন, আবার কেউ ঋণ নিয়ে চিকিৎসার বিল পরিশোধ করতেন।

এই বাস্তবতা থেকেই দেশটি ধাপে ধাপে বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা চালু করে। ২০০৬ সালে প্রথম আবুধাবি এবং পরে দুবাই এই ব্যবস্থা কার্যকর করে। তবে শারজাহ, আজমান, রাস আল খাইমাহ, ফুজাইরাহ ও উম্ম আল কুয়াইনে তখনও এমন বাধ্যবাধকতা ছিল না। সেই বৈষম্যের অবসান ঘটে ২০২৫ সালের ১ জানুয়ারি, যখন সাতটি আমিরাতেই বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর হয়। ২০২৬ সালে এসে স্বাস্থ্য বীমা আর শুধু চিকিৎসা ব্যয় মেটানোর ব্যবস্থা নয়; এটি বৈধ চাকরি, বসবাস এবং অনেক ক্ষেত্রে রেসিডেন্স ভিসা পাওয়া বা নবায়নেরও গুরুত্বপূর্ণ শর্তে পরিণত হয়েছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সব কর্মীর স্বাস্থ্য বীমা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার। কর্মী ফুল-টাইম, পার্ট-টাইম বা চুক্তিভিত্তিক- যে ধরনেরই হোন না কেন, তিনি এই সুবিধার আওতায় পড়বেন। একই নিয়ম গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। তবে যারা নিজেরাই ভিসার স্পন্সর, যেমন বিনিয়োগকারী, ফ্রিল্যান্সার, স্ব-স্পন্সর বাসিন্দা কিংবা অনেক ফ্রি-জোন ভিসাধারী, তাদের নিজ উদ্যোগেই স্বাস্থ্য বীমা কিনতে হয়। আবুধাবিতে অনেক ক্ষেত্রে কর্মীর পাশাপাশি তার একজন স্ত্রী এবং ১৮ বছরের কম বয়সী সর্বোচ্চ তিন সন্তানের স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থাও নিয়োগকর্তাকে করতে হয়। নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বাবা-মায়ের জন্যও কভারেজের সুযোগ রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের পাঁচ আমিরাতে সরকার অনুমোদিত বেসিক স্বাস্থ্য বীমার বার্ষিক প্রিমিয়াম ৩২০ দিরহাম। পলিসির মেয়াদ দুই বছর হলেও নির্ধারিত হারে প্রিমিয়াম পরিশোধ করতে হয় এবং ভিসা বাতিল হলে দ্বিতীয় বছরের প্রিমিয়ামের একটি অংশ ফেরত পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। অন্যদিকে আবুধাবিতে কর্মীর বয়স ও ক্যাটাগরির ভিত্তিতে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করা হয়। ২০২৬ সালের হালনাগাদ হার অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের ১৮ থেকে ৪০ বছর বয়সী কর্মীদের জন্য বেসিক পরিকল্পনার বার্ষিক প্রিমিয়াম শুরু হয় ৯৯৭ দশমিক ৫০ দিরহাম থেকে।

বেসিক স্বাস্থ্য বীমায় সাধারণ চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, হাসপাতালে ভর্তি, জরুরি চিকিৎসা, অস্ত্রোপচার, ল্যাব পরীক্ষা, এক্স-রে, নির্ধারিত ওষুধ এবং ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আগে থেকেই থাকা দীর্ঘমেয়াদি রোগের ক্ষেত্রেও অপেক্ষার সময় ছাড়াই কভারেজ দেয়া হয়। তবে সব চিকিৎসা বিনামূল্যে নয়। হাসপাতালে ভর্তি ও বহির্বিভাগের চিকিৎসায় রোগীকে নির্ধারিত হারে কো-পেমেন্ট দিতে হয়। পাশাপাশি এই পরিকল্পনা নির্ধারিত হাসপাতাল ও ক্লিনিকের নেটওয়ার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উন্নত ডেন্টাল চিকিৎসা, কসমেটিক সার্জারি, মাতৃত্বসেবা এবং কিছু বিশেষায়িত চিকিৎসা বেসিক প্যাকেজের বাইরে থাকায় অতিরিক্ত সুবিধার জন্য উচ্চতর পরিকল্পনা নিতে হয়।

নতুন ব্যবস্থায় কর্মীর প্রথম কর্মদিবস থেকেই স্বাস্থ্য বীমা কার্যকর করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। বীমা না থাকলে বা এর মেয়াদে বিরতি ঘটলে নিয়োগকর্তা প্রশাসনিক জটিলতা, আর্থিক জরিমানা এবং ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যার মুখোমুখি হতে পারেন। অন্যদিকে ২০২৫ সালের শুরু থেকে নতুন বা নবায়ন হওয়া অধিকাংশ রেসিডেন্স পারমিটের ক্ষেত্রেও সক্রিয় স্বাস্থ্য বীমা একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। ফলে স্বাস্থ্য বীমা এখন শুধু চিকিৎসা ব্যয়ের সুরক্ষা নয়, বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করারও অন্যতম ভিত্তি।

বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য বীমা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের প্রবাসীদের জন্য চিকিৎসা ব্যয়ের বড় ঝুঁকি কমাবে। একই সঙ্গে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে, কর্মীদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাবে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিয়োগকর্তারাও দক্ষ কর্মী ধরে রাখা ও আইনি ঝুঁকি কমানোর সুবিধা পাবেন। চিকিৎসা ব্যয় থেকে আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পাশাপাশি এই নীতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শ্রমবাজার ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থাকেও আরও সুসংগঠিত করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য সমূহ ()

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।