নিজস্ব প্রতিবেদক: একজন বীমাগ্রাহকের অভিযোগ শুনছেন সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক কিংবা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা। পুরো প্রক্রিয়াটি পর্যবেক্ষণ করছেন সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা।
ভারতের বীমা খাতে অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে যে পরিবর্তন এসেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এটি। এর প্রতিফলনও দেখা গেছে ২০২৬ সালের মে মাসের গ্রিভ্যান্স রিড্রেসাল অ্যাসেসমেন্ট অ্যান্ড ইনডেক্স (জিআরএআই)-এর ফলাফলে। ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ডিপার্টমেন্ট অব ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের (ডিএফএস) বীমা বিভাগ সেখানে ‘গ্রুপ-এ’ শ্রেণিতে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।
এই শ্রেণিতে প্রতি মাসে অন্তত ৫০০টি অভিযোগ পাওয়া সরকারি বিভাগগুলোকে মূল্যায়ন করা হয়। একই সূচকে ডিএফএসের ব্যাংকিং বিভাগ ষষ্ঠ হয়েছে। এর আগে ২০২৬ সালের মার্চে বীমা বিভাগ একই সূচকে প্রথম হয়েছিল।
কীভাবে এলো এই পরিবর্তন?
এই পরিবর্তনের পেছনে প্রশাসনিক তদারকি, নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি থেকে ডিএফএস সচিব প্রতি মাসে এলোমেলোভাবে নির্বাচিত ২০টি অভিযোগ সরাসরি পর্যালোচনা করছেন। এসব শুনানিতে অভিযোগকারীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।
এর ফলে অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়টি শুধু সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না; প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ও সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আসছে।
এ ছাড়া একটি বিশেষ সেল প্রতিদিন সেন্ট্রালাইজড পাবলিক গ্রিভ্যান্স রিড্রেস অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম (সিপিজিআরএএমএস) পোর্টালে জমা পড়া অভিযোগ পর্যবেক্ষণ করে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাপ্তাহিক বৈঠকে অভিযোগগুলোর অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
অনলাইন ট্র্যাকিং, অভিযোগকারীর প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ, কর্মদক্ষতার ড্যাশবোর্ড এবং অভিযোগ সরাসরি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর ব্যবস্থাও নিষ্পত্তি প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করেছে।
জিআরএআই কী পরিমাপ করে?
জিআরএআই চারটি প্রধান মাত্রার অধীন ১১টি সূচকের ভিত্তিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা মূল্যায়ন করে।
এর মধ্যে রয়েছে অভিযোগ নিষ্পত্তির দক্ষতা, সমাধানে প্রয়োজনীয় সময়, ঝুলে থাকা অভিযোগের সংখ্যা, নিষ্পত্তির মান, অভিযোগকারীর প্রতিক্রিয়া এবং প্রতিষ্ঠানের সাংগঠনিক সক্ষমতা।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সূচকটির হিসাব আরও স্বচ্ছ ও সহজে যাচাইযোগ্য করার লক্ষ্যে ‘নরমালাইজেশন’ পদ্ধতি বাদ দেয়া হয়েছে।
তবে এই সূচকের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এটি মূলত সিপিজিআরএএমএস পোর্টালে জমা পড়া অভিযোগের ভিত্তিতে তৈরি। সরাসরি বীমা কোম্পানি, আইআরডিএআই'র কাছে যাওয়া সব অভিযোগ এতে অন্তর্ভুক্ত হয় না।
ফলে জিআরএআই সরকারি অভিযোগ ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মদক্ষতা সূচক হলেও, এটিকে ভারতের পুরো বীমা খাতে গ্রাহক সন্তুষ্টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে দেখা যায় না।
গ্রাহকদের অভিযোগ কী নিয়ে?
ভারতের বীমা খাতে সাধারণ অভিযোগের মধ্যে রয়েছে দাবি প্রত্যাখ্যান, দাবি নিষ্পত্তিতে বিলম্ব, পলিসির শর্ত ভুল বা অসম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা, প্রিমিয়াম-সংক্রান্ত জটিলতা এবং গ্রাহকের সঙ্গে দুর্বল যোগাযোগ।
ডিএফএস শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বীমা ও পেনশন নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারি ব্যাংক এবং বীমা প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের নিয়ে অভিযোগের মূল কারণও বিশ্লেষণ করছে।
প্রতিষ্ঠানভিত্তিক র্যাংকিং, দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, স্বচ্ছ যোগাযোগ এবং গ্রাহকসেবা প্রশিক্ষণের মতো উদ্যোগগুলো এই ব্যবস্থাকে প্রচলিত সরকারি অভিযোগ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া থেকে আলাদা করেছে।
তবে এখনো কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ডিএফএসের ব্যাংকিং ও বীমা বিভাগ যৌথভাবে বছরে আড়াই লাখের বেশি অভিযোগ পেলেও এর মধ্যে বীমা বিভাগের অংশ কত, গড় নিষ্পত্তির সময় কত কিংবা কত শতাংশ অভিযোগ পুনরায় খোলা হয়েছে- এসবের আলাদা পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলছে?
অস্ট্রেলিয়ায় সাধারণ আর্থিক অভিযোগের লিখিত জবাব সাধারণত ৩০ দিনের মধ্যে দিতে হয়। দেশটির নন-লাইফ বীমা খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশ অভিযোগ ৩১ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছিল।
যুক্তরাজ্যে অধিকাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রে আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে আট সপ্তাহের মধ্যে চূড়ান্ত উত্তর দিতে হয়। এরপরও গ্রাহক সন্তুষ্ট না হলে তিনি ফাইন্যান্সিয়াল ওমবাডসম্যান সার্ভিসের কাছে যেতে পারেন।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থা থাকাই যথেষ্ট নয়; নির্দিষ্ট সময়সীমা, কার্যকর তদারকি এবং প্রকাশ্য কর্মদক্ষতা মূল্যায়নও কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে
বাংলাদেশের বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) অভিযোগ ফরম, ফোকাল কর্মকর্তা, বীমাগ্রাহক পোর্টাল এবং ২০২৪ সালের গ্রাহক সুরক্ষা ও দাবি ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা চালু করেছে।
নির্দেশিকায় পরিচালনা পর্ষদের অধীন অভিযোগ প্রতিকার কমিটি এবং অনলাইন দাবি-ট্র্যাকিং ব্যবস্থার কথাও বলা হয়েছে।
তবে অভিযোগ নিষ্পত্তির গড় সময়, পুনরায় খোলা অভিযোগের হার, গ্রাহক সন্তুষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মদক্ষতার তুলনাযোগ্য প্রকাশ্য ড্যাশবোর্ড এখনো সীমিত।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের নন-লাইফ বীমা খাতে ৩ হাজার ৮৭১ কোটি টাকার দাবির বিপরীতে প্রায় ৩২ শতাংশ অর্থ পরিশোধের তথ্য দাবি নিষ্পত্তি ব্যবস্থার দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়।
ভারতের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত করে, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন, শীর্ষ পর্যায়ের তদারকি এবং অভিযোগের মূল কারণ বিশ্লেষণের মতো ব্যবস্থাও গ্রাহকসেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশেও অভিযোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে সেগুলোর কার্যকারিতা, স্বচ্ছতা এবং ফলাফল মূল্যায়নে নিয়মিত ও তুলনাযোগ্য তথ্য প্রকাশের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।