নিজস্ব প্রতিবেদক: বৈশ্বিক আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলা, বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুর্যোগের ক্ষতি সামাল দিতে বীমা ও পুনর্বীমার কার্যকর ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে আন্তর্জাতিক আর্থিক আলোচনায়। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্যও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা এবং বিনিয়োগ সুরক্ষার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এসব সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে দেশের বীমা খাতের আর্থিক সক্ষমতা, দাবি নিষ্পত্তি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থায় আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি।
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে ১২ থেকে ১৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ২০২৬ সালের বার্ষিক সভা। এবারের সভার কর্মসূচিতে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, নতুন অর্থায়নের পথ তৈরি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মতো বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। বিনিয়োগের ঝুঁকি কমাতে পুঁজিবাজার, স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়ন, আর্থিক নিশ্চয়তা এবং নীতিগত সংস্কারের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
যদিও বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্য নির্দিষ্ট কোনো অর্থায়ন বা নতুন প্রকল্পের ঘোষণা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি, তবু সভার আলোচ্য বিষয়গুলো দেশের বীমা খাতের দীর্ঘদিনের সমস্যার সমাধানে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
দুর্বল বীমা খাতে সংস্কারের প্রয়োজন
বাংলাদেশের বীমা খাতের বড় চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে সময়মতো বীমা দাবি পরিশোধ, কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা, গ্রাহকের আস্থা বৃদ্ধি এবং নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার কার্যকারিতা জোরদার করা। বিশেষ করে যেসব কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরে দাবি পরিশোধে সমস্যায় রয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং দায় পরিশোধের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে কারিগরি সহায়তা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর তদারকি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামো উন্নয়নের অভিজ্ঞতা নেয়া যেতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের কোনো নির্দিষ্ট কর্মসূচি বাংলাদেশের জন্য গৃহীত হয়েছে এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ক্ষেত্র। কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা নিরূপণ, ঝুঁকির বিপরীতে পর্যাপ্ত মূলধন রাখা, পুনর্বীমা ব্যবস্থার মান উন্নয়ন এবং গ্রাহকের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা গেলে খাতটির ওপর আস্থা বাড়তে পারে।
দুর্যোগ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ঝুঁকি বীমার সুযোগ
বাংলাদেশের মতো বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশে দুর্যোগের আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় বীমার ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, আবাসন এবং অবকাঠামো খাতে কার্যকর ঝুঁকি বীমা চালু করা গেলে দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও প্রতিষ্ঠানকে দ্রুত আর্থিক সহায়তা দেয়া সম্ভব।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সংকট প্রস্তুতি ও মোকাবিলা কাঠামোয় দুর্যোগ বন্ড, বীমা এবং অন্যান্য ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা পণ্য ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে। এর মাধ্যমে দুর্যোগের সময় বীমা ব্যবস্থার আওতায় অর্থ পাওয়া গেলে সরকারের ওপর তাৎক্ষণিক ব্যয়ের চাপ কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা ও পুঁজিবাজারের মাধ্যমে বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি ভাগ করে নেয়াও এর উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে এ ধরনের ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা যাচাই করা যেতে পারে। বিশেষ করে কৃষকদের জন্য আবহাওয়াভিত্তিক বীমা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য দুর্যোগ বীমা এবং সরকারি অবকাঠামোর জন্য ঝুঁকি সুরক্ষা কর্মসূচি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো সম্ভব।
তবে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু করতে হলে সম্ভাব্য ক্ষতির নির্ভরযোগ্য তথ্য, ঝুঁকি নিরূপণের সক্ষমতা, স্বচ্ছ দাবি নিষ্পত্তি এবং উপযুক্ত পুনর্বীমা অংশীদার প্রয়োজন।
বিদেশি বিনিয়োগে ঝুঁকি কমাতে বীমার ভূমিকা
বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, নিয়ন্ত্রক ও বাণিজ্যিক ঝুঁকি বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা ও ঝুঁকি বীমা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের আওতাধীন বহুপক্ষীয় বিনিয়োগ নিশ্চয়তা সংস্থা (মিগা) বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট ঝুঁকির বিপরীতে নিশ্চয়তা দেয়ার ব্যবস্থা পরিচালনা করে। এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে যোগ্য বিনিয়োগ প্রকল্পের ঝুঁকি কমানো এবং বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণে সহায়তা করা সম্ভব।
বাংলাদেশে শিল্প, জ্বালানি, অবকাঠামো ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে এ ধরনের নিশ্চয়তা ব্যবস্থার সুযোগ খতিয়ে দেখা যেতে পারে। তবে এ সুবিধা সব বিনিয়োগকারী বা সব প্রকল্পের জন্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়, প্রকল্পের ধরন, যোগ্যতা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার শর্ত পূরণ করতে হয়।
প্রযুক্তিনির্ভর বীমা ও সুশাসনে জোর
বীমা খাতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ, দাবি যাচাই এবং জালিয়াতি প্রতিরোধও গুরুত্বপূর্ণ। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে পলিসির তথ্য যাচাই, প্রিমিয়াম সংগ্রহ ও দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ করার সুযোগ তৈরি হয়।
একই সঙ্গে কোম্পানিগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন, দায় ও সম্পদের তথ্য এবং পুনর্বীমা সংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। এতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগেভাগে দুর্বল কোম্পানি শনাক্ত করতে পারবে এবং গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষায় সময়মতো ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ পাবে।
আন্তর্জাতিক আর্থিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে এ ধরনের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়া যেতে পারে। তবে প্রযুক্তি স্থাপনই যথেষ্ট নয়, তথ্যের নির্ভুলতা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং নিয়ম লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এখন বাংলাদেশের করণীয় কী
বার্ষিক সভাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে বীমা খাতের সমস্যাগুলো সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্র চিহ্নিত করা। এ ক্ষেত্রে বীমা দাবি নিষ্পত্তির সক্ষমতা বাড়ানো, দুর্বল কোম্পানির আর্থিক পুনর্গঠন, কৃষি ও জলবায়ু ঝুঁকি বীমা, পুনর্বীমা বাজার উন্নয়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর তদারকিকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনায় কোন ক্ষেত্রে অর্থায়ন, কোন ক্ষেত্রে কারিগরি সহায়তা এবং কোন ক্ষেত্রে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন তা আলাদা করে নির্ধারণ করা জরুরি।
বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও এর সুফল নির্ভর করবে দেশের নিজস্ব সংস্কার, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্ষমতা এবং গ্রাহকের দাবি পরিশোধে কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর। বার্ষিক সভার আলোচনা সেই সংস্কারের জন্য অভিজ্ঞতা ও সহযোগিতা নেয়ার একটি সুযোগ হতে পারে, তবে নির্দিষ্ট অর্থায়ন বা প্রকল্পের ঘোষণা ছাড়া একে বাংলাদেশের বীমা খাতের জন্য নতুন আন্তর্জাতিক সহায়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।