মুখ্য নির্বাহী ছাড়াই বীমা ব্যবসা: আইডিআরএ’র নিয়ম প্রয়োগে প্রশ্ন

এ কে এম এহসানুল হক, এফসিআইআই: দেশের বীমা খাতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগকে ঘিরে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা এখন একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিচ্ছে। বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, একাধিক জীবন ও সাধারণ বীমা কোম্পানি মাসের পর মাস মুখ্য নির্বাহী ছাড়াই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো বীমা কোম্পানি তিন মাসের বেশি সময় মুখ্য নির্বাহী শূন্য রেখে ব্যবসা পরিচালনা করতে পারে না। প্রয়োজন হলে আইডিআরএ এই সময়সীমা আরও তিন মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারে, তবে সর্বোচ্চ ছয় মাসের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন না হলে কর্তৃপক্ষের হাতে প্রশাসক নিয়োগের ক্ষমতাও রয়েছে। বাস্তবতা হলো, নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করে গেলেও কিছু কোম্পানি নিয়োগে ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- এই ব্যর্থতার পরও আইন অনুযায়ী কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের নজির খুব বেশি দেখা যাচ্ছে না। এতে বীমা খাতে নিয়ন্ত্রক প্রয়োগের ধারাবাহিকতা এবং বাজার শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বীমা খাতে মুখ্য নির্বাহী পদটি একটি প্রতিষ্ঠানের চালিকাশক্তি। এটি এমন একটি দায়িত্ব, যেখানে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, দাবি পরিশোধ, পুনর্বীমা কৌশল, বিনিয়োগ পরিচালনা, নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং করপোরেট সুশাসনের মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রগুলোর সিদ্ধান্ত ও জবাবদিহি কেন্দ্রীভূত থাকে। দীর্ঘ সময় মুখ্য নির্বাহী ছাড়া কোনো কোম্পানির পরিচালনা কার্যত ‘অস্থায়ী’ কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে যায়, যেখানে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি কমে, দায়িত্ব বণ্টনে অস্পষ্টতা তৈরি হয় এবং নীতিধারকের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়ে। খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের শূন্য নেতৃত্বের ফলে দাবি নিষ্পত্তি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, গ্রাহকসেবার মান হ্রাস এবং ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। যেহেতু বীমা মূলত দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাস ও চুক্তিনির্ভর ব্যবসা, তাই নেতৃত্বের ঘাটতি বাজারের আস্থাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করে।
এই সংকটকে আরও গভীর করছে একটি নীতিগত বাস্তবতা- আইনের উপস্থিতি থাকলেও প্রয়োগে দৃঢ়তা না থাকলে নিয়ম কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে। বীমা আইন ও আইডিআরএ’র বিধান অনুযায়ী সময়সীমা পার হয়ে গেলে প্রশাসক নিয়োগ একটি সম্ভাব্য ব্যবস্থা, যা কোম্পানির কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রিত করতে এবং নীতিধারকের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে। কিন্তু সূত্রগুলো বলছে, সময়সীমা অতিক্রম করলেও একাধিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণের দৃশ্যমানতা কম। ফলে বাজারে এমন ধারণা তৈরি হচ্ছে যে নিয়ম ভঙ্গ করেও দীর্ঘ সময় কার্যক্রম চালানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলো নৈতিক ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পিছিয়ে পড়ে, আর অনিয়মের প্রবণতা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার গ্রহণযোগ্যতা ও আস্থাও তখন প্রশ্নবিদ্ধ হয়, যা পুরো খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর।
অন্যদিকে, নিয়োগ সংকটের পেছনে বাস্তব সমস্যা আছে- এ কথাও অস্বীকার করছেন না সংশ্লিষ্টরা। বীমা খাতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ নির্বাহী নেতৃত্বের ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে এমন পেশাদার যারা একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক কাঠামো বুঝবেন, ঝুঁকি ও দায় ব্যবস্থাপনায় দক্ষ হবেন এবং করপোরেট সুশাসনের মানদণ্ড বজায় রেখে কোম্পানিকে পরিচালনা করতে পারবেন। তবে এই বাস্তব সংকটের মধ্যেও সমাধান পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ স্পষ্ট। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ বলছেন, ব্যাংক খাত থেকে নির্বাহী এনে বীমা খাতের শূন্যস্থান পূরণের চিন্তা সব ক্ষেত্রে কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ ব্যাংকিং ও বীমার ব্যবসায়িক প্রকৃতি মৌলিকভাবে ভিন্ন; বীমায় দীর্ঘমেয়াদি দায়, পুনর্বীমা কাঠামো, দাবি ব্যবস্থাপনা এবং পলিসি ভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন- এসব বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তাই কেবল ব্যাংকিং দক্ষতা দিয়ে বীমা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব সংকট সমাধান হবে- এমন ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সব সময় সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বীমা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এমন বহু পেশাজীবী রয়েছেন যারা দীর্ঘদিন ধরে বীমা শিল্পে কাজ করছেন এবং এই খাতের কার্যক্রম ও বাস্তবতা সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত। তাদের যুক্তি, আইডিআরএ’র উচিত অভ্যন্তরীণ দক্ষ জনবলকে অগ্রাধিকার দেয়া এবং যোগ্যতা-ভিত্তিক নেতৃত্ব তৈরির জন্য নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করা। কারণ খাতের ভিতর থেকে নেতৃত্ব তৈরি হলে তা দীর্ঘমেয়াদে দক্ষতার ঘাটতি কমায়, প্রতিষ্ঠানগুলোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখে এবং বাজারে পেশাগত মান উন্নত করে। একই সঙ্গে এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগকে স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। খাত সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোথাও কোথাও বোর্ডের অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কোথাও যোগ্যতা যাচাইয়ের জটিলতা, আবার কোথাও অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা- সব মিলিয়ে নিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ছে। ফলে সময়মতো সিদ্ধান্ত না হলে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ‘অস্থায়ী’ভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট নিরসনে আইডিআরএ’র সামনে এখন একটি দ্বিমুখী দায়িত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একদিকে, নেতৃত্বশূন্যতা যেন কোনো অবস্থাতেই দীর্ঘায়িত না হয়- সে জন্য নিয়ম প্রয়োগকে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক করতে হবে। অন্যদিকে, বাস্তব বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় দক্ষ নেতৃত্ব তৈরির পথও খুলতে হবে, যাতে যোগ্য লোকের অভাব দেখিয়ে নিয়ম ভঙ্গ করার প্রবণতা কমে। নীতিনির্ধারক পর্যায়ের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল শক্তি হলো পূর্বানুমেয়তা এবং ধারাবাহিকতা- একই নিয়ম সবার ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রয়োগ হবে- এমন বার্তাই বাজারে স্থিতিশীলতা আনে।
বীমা খাতে এই মুহূর্তে আস্থা পুনর্গঠন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। নীতিধারকের চোখে বীমা কোম্পানির শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারিত হয় দাবি পরিশোধের সক্ষমতা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে। মুখ্য নির্বাহী নিয়োগে দীর্ঘসূত্রতা বা নেতৃত্বশূন্যতা থাকলে এই তিনটি ক্ষেত্রই দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই মুখ্য নির্বাহী সংকটকে কেবল প্রশাসনিক জটিলতা হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি এখন বাজার শৃঙ্খলা, নিয়ন্ত্রক কর্তৃত্ব এবং জনস্বার্থ সুরক্ষার বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, আইডিআরএ দ্রুত বাস্তবসম্মত ও কার্যকর উদ্যোগ নেবে- যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হয়, সময়মতো নেতৃত্ব নিশ্চিত হয় এবং নিয়ম অমান্যের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা দৃশ্যমান হয়। তবেই বীমা খাতে প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা, পেশাদারিত্ব এবং সাধারণ মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।




