ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের যুগে বাংলাদেশে ব্যাংকাস্যুরেন্স কেন গুরুত্বপূর্ণ

রাজ কিরণ দাস: বাংলাদেশের আর্থিক খাতে ব্যাংকাস্যুরেন্স এখন আর একটি পরীক্ষামূলক ধারণা নয়; এটি ধীরে ধীরে একটি কৌশলগত রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে। ব্যাংক ও বীমা খাতের এই অংশীদারিত্বের মূল লক্ষ্য একীভূত আর্থিক সেবা নিশ্চিত করা, যেখানে গ্রাহক একটি মাত্র ডিজিটাল পরিবেশে তার ব্যাংকিং ও বীমা-সংক্রান্ত সব প্রয়োজন মেটাতে পারেন। ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল ব্যাংকিং গ্রহণযোগ্যতা এবং স্মার্টফোননির্ভর সেবার বিস্তারের ফলে এই মডেলটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকাস্যুরেন্সের সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছে গ্রাহক অভিজ্ঞতা। বাংলাদেশের গ্রাহকরা এখনও অনেক ক্ষেত্রে বীমা সেবাকে জটিল, সময়সাপেক্ষ ও আস্থাহীন বলে মনে করেন। ব্যাংকের পরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বীমা সেবা সহজভাবে উপস্থাপন করা গেলে এই ধারণা বদলানো সম্ভব। ব্যাংকিং অ্যাপের মধ্যেই বীমা পলিসি ব্যবস্থাপনা ও দাবি সংক্রান্ত সেবা যুক্ত হলে গ্রাহকের জন্য তা স্বচ্ছতা ও সুবিধা- দুইই বাড়ায়।

বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক বাস্তবতা এই অংশীদারিত্বে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যাংক ও বীমা খাতের পৃথক নিয়ন্ত্রণ কাঠামোকে কার্যকরভাবে সমন্বয় করা না গেলে গ্রাহক অভিজ্ঞতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই সফল ব্যাংকাস্যুরেন্স মডেলে নিয়ন্ত্রক শর্তগুলোকে ডিজিটাল প্রক্রিয়ার সঙ্গে এমনভাবে একীভূত করা হয়, যাতে গ্রাহক অপ্রয়োজনীয় জটিলতায় না পড়ে এবং একই সঙ্গে নীতিমালার পূর্ণ অনুসরণ নিশ্চিত হয়। এর পাশাপাশি গ্রাহকের তথ্য সুরক্ষা ও ডেটা ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা বজায় রাখা আস্থার ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করে।

অংশীদারিত্বের গুণগত মানই নির্ধারণ করে ব্যাংকাস্যুরেন্স কতটা টেকসই হবে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, যেসব ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান কেবল স্বল্পমেয়াদি বিক্রয় লক্ষ্যকে প্রাধান্য দেয়, সেখানে গ্রাহক সন্তুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বিপরীতে, যেসব অংশীদারিত্বে অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি, সাংগঠনিক সামঞ্জস্য এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রাধান্য পায়, সেখানে সেবা মান ও গ্রাহক ধরে রাখার সক্ষমতা বাড়ে। বাংলাদেশের মতো উদীয়মান বাজারে এই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

ডেটা ও বিশ্লেষণ সক্ষমতা ব্যাংকাস্যুরেন্সকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। ব্যাংকের বিদ্যমান গ্রাহক তথ্য বীমা প্রতিষ্ঠানকে গ্রাহকের আর্থিক আচরণ ও ঝুঁকিপ্রবণতা সম্পর্কে গভীর ধারণা দেয়। এই অন্তর্দৃষ্টি ব্যবহার করে ব্যক্তিকৃত ও প্রাসঙ্গিক বীমা সমাধান তৈরি করা সম্ভব, যা গ্রাহকের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে ডিজিটাল চ্যানেল ও কল সেন্টারের কার্যকর ব্যবহার দেশের প্রত্যন্ত এলাকাতেও বীমা সেবার পরিধি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যাংকাস্যুরেন্স আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, প্রান্তিক গ্রাহক এবং নতুন প্রাতিষ্ঠানিক সেগমেন্টের জন্য উপযোগী বীমা সমাধান ব্যাংকের বিদ্যমান সম্পর্কের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া তুলনামূলকভাবে সহজ। এতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী হয় এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্থিতিশীলতা আসে। একই সঙ্গে ব্যাংকের ডিজিটাল যাত্রার সঙ্গে বীমা সেবার গভীর সংযুক্তি একটি সমন্বিত আর্থিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলে।

দেশের ব্যাংকাস্যুরেন্স খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দ্রুত ডিজিটাল রূপান্তর, নিয়ন্ত্রক সচেতনতা এবং গ্রাহকের পরিবর্তিত প্রত্যাশা এই মডেলকে এগিয়ে নেয়ার সুযোগ তৈরি করছে। তবে এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে গ্রাহককে কেন্দ্রে রেখে পারস্পরিক আস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্বের ওপর জোর দিতে হবে। তা হলেই ব্যাংকাস্যুরেন্স বাংলাদেশের আর্থিক খাতের রূপান্তরে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভূমিকা রাখতে পারবে।