বীমা খাতে সংকট: নীতি দুর্বলতা, জবাবদিহিতার অভাব ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

এ কে এম এহসানুল হক, এফসিআইআই: বাংলাদেশের বীমা খাত বর্তমানে এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। দীর্ঘদিন ধরে এই খাতে নৈরাজ্য, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতার অভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ফলে বীমার মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক খাতের প্রতি জনসাধারণের আস্থা ক্রমেই কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হলো সরকারি নীতির দুর্বলতা এবং তার কার্যকর বাস্তবায়নের ঘাটতি। ২০১০ সালের বীমা আইন বর্তমান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আইনের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও অস্পষ্টতা খাতটিকে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হচ্ছে।

অন্যদিকে, বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)-এর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং অনিয়ম দমনে কঠোর ভূমিকা নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সংস্থাটিকে অনেক ক্ষেত্রেই নিষ্ক্রিয় ও অদক্ষ মনে হচ্ছে।

বীমা খাতের মূল উদ্দেশ্য হলো দুর্যোগ বা সংকটের সময় গ্রাহকের পাশে দাঁড়ানো। কিন্তু বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। আইন অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে বীমা দাবি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকলেও অধিকাংশ কোম্পানি তা মানছে না। ফলে গ্রাহকরা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন এবং বীমার প্রতি আস্থা হারাচ্ছেন।

এছাড়া বীমা কোম্পানিগুলোর মধ্যে দায়বদ্ধতার ঘাটতিও স্পষ্ট। দাবি নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা, অজুহাত এবং অনাগ্রহ খাতটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে। এর ফলে নতুন গ্রাহক আকর্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং বিদ্যমান গ্রাহকরাও বিমুখ হচ্ছেন।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য বীমা আইন ২০১০-এর ব্যাপক সংস্কার জরুরি। বিশেষ করে আইডিআরএ-কে আরও ক্ষমতায়ন করতে হবে, যাতে তারা কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি করতে পারে। আইন লঙ্ঘনকারী কোম্পানির বিরুদ্ধে বড় অঙ্কের জরিমানা, লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান থাকা প্রয়োজন।

একইসঙ্গে আর্থিকভাবে দুর্বল বা ঝুঁকিপূর্ণ বীমা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। অন্যথায় পুরো খাতের স্থিতিশীলতা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

শক্তিশালী নীতিমালা, কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে বীমা খাতের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠবে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই খাত শুধু সংকটেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।