‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌
‌

‌

ভারতে কমিশন সংস্কার কার্যকর হলে ব্রোকারদের আয় ৬০-৭০ শতাংশ কমার আশঙ্কা

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৪ পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক: ভারতে বীমা বিক্রির কমিশনে নতুন সীমা আরোপ করা হলে ব্রোকারদের আয় ৬০-৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে বলে আশঙ্কা করছে ইন্স্যুরেন্স ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া (আইবিএআই)। সংগঠনটির দাবি, এতে আগামী পাঁচ বছরে অন্তত ১০ লাখ মানুষের জীবিকা ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর ভারতের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইআরডিএআই কমিশন ও বীমা বিক্রির খরচ কমানোর প্রস্তাব প্রকাশ করে। প্রস্তাবের ওপর ৬৫০টির বেশি মতামত জমা পড়ায় সময়সীমা ২৫ অক্টোবর থেকে বাড়িয়ে ৩১ অক্টোবর করা হয়েছে। নতুন নিয়ম এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বীমা ব্রোকার হলো এমন প্রতিষ্ঠান, যারা গ্রাহককে বিভিন্ন কোম্পানির বীমা বেছে নিতে ও কিনতে সহায়তা করে। বিনিময়ে তারা বীমা কোম্পানি থেকে কমিশন পায়।

২০২৩ সালে ভারত বিভিন্ন বীমা পণ্যের কমিশনের সর্বোচ্চ সীমা তুলে দিয়েছিল। পরিবর্তে কোম্পানিগুলোর মোট পরিচালন খরচের সীমা নির্ধারণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল খরচের বিষয়ে কোম্পানিগুলোকে আরও স্বাধীনতা দেয়া। কিন্তু নিয়ন্ত্রকের হিসাবে, কমিশন বাড়লেও গ্রাহকের সুবিধা ও বীমার আওতা প্রত্যাশামতো বাড়েনি।

আইআরডিএআই'র তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে লাইফ বীমার করপোরেট এজেন্টদের একটি বড় অংশের হিসাবে নতুন পলিসি থেকে প্রিমিয়াম আয় ২৮ শতাংশ বাড়লেও কমিশনসহ পারিশ্রমিক বেড়েছে ১২৫ শতাংশ। করপোরেট এজেন্ট হলো ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠান, যারা বীমা কোম্পানির হয়ে পলিসি বিক্রি করে। আর প্রিমিয়াম হলো বীমার জন্য গ্রাহকের দেয়া টাকা।

একই সময়ে নন-লাইফ বীমায় ব্রোকারদের মাধ্যমে সংগৃহীত প্রিমিয়াম ৩৭ শতাংশ বাড়লেও কমিশন বেড়েছে ১৭৩ শতাংশ। এ খাতে ব্রোকারদের গড় কমিশনের হারও ৮ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৭ শতাংশ হয়েছে।

নিয়ন্ত্রকের মতে, বড় বিক্রেতাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা ও অতিরিক্ত প্রণোদনার কারণে কমিশন বেড়েছে। আইআরডিএআই'র নথিতে আরও বলা হয়েছে, আগে অন্য খাতে দেখানো বীমা বিক্রির কিছু খরচ এখন কমিশনের হিসাবে আনা হচ্ছে। ফলে কমিশন বৃদ্ধির পুরো অংশই নতুন খরচ নয়। তবে কোম্পানিগুলোর মোট পরিচালন খরচ বেড়েছে।

নতুন প্রস্তাবে নির্দিষ্ট ধরনের লাইফ বীমার প্রথম বছরের কমিশন ব্রোকারসহ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের জন্য ৫-২০ শতাংশ এবং সরাসরি এজেন্টদের জন্য ৬ দশমিক ২৫-২৫ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে। বীমার ধরন ও কত বছর প্রিমিয়াম দিতে হবে, তার ওপর এই হার নির্ভর করবে।

ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবীমার নতুন পলিসিতে ব্রোকারসহ বিক্রয় প্রতিষ্ঠানের কমিশন সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ এবং নবায়নে ৫ শতাংশ হবে। একই ক্ষেত্রে সরাসরি এজেন্টদের জন্য যথাক্রমে ২০ ও ১০ শতাংশ কমিশনের প্রস্তাব রয়েছে। সরাসরি এজেন্টরা সাধারণত নির্দিষ্ট কোম্পানির বীমা বিক্রি করেন। ব্রোকারদের আশঙ্কা, তাদের তুলনায় সরাসরি এজেন্টদের বেশি কমিশন দেয়ায় প্রতিযোগিতায় তারা পিছিয়ে পড়তে পারেন।

নতুন গাড়ির বাধ্যতামূলক তৃতীয় পক্ষের বীমায় ব্রোকারদের কমিশন শূন্য করার প্রস্তাব রয়েছে। তবে সরাসরি এজেন্টরা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিশন পাবেন। এই বীমায় গাড়ির কারণে অন্য ব্যক্তি বা তার সম্পদের ক্ষতি হলে ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যবস্থা থাকে।

এ ছাড়া ঋণের সঙ্গে বিক্রি করা নির্দিষ্ট লাইফ বীমায় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের কমিশন সর্বোচ্চ ২-২ দশমিক ৫ শতাংশ রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ঋণের শর্ত হিসেবে গ্রাহককে বীমা কিনতে বাধ্য করার ওপরও নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব রয়েছে। তবে গ্রাহকের সম্মতি ও স্পষ্ট আর্থিক সুবিধা থাকলে নির্দিষ্ট শর্তে ঋণের সঙ্গে বীমা দেয়ার সুযোগ থাকবে।

পাশাপাশি পাঁচ বছরের মধ্যে লাইফ বীমায় পরিচালন খরচের সর্বোচ্চ সীমা মোট প্রিমিয়ামের ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং নন-লাইফ বীমায় দেশের ভেতরে সরাসরি সংগৃহীত প্রিমিয়ামের ২০ শতাংশে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কমিশন ছাড়াও কর্মীদের বেতন, অফিস পরিচালনাসহ অন্যান্য খরচ এর মধ্যে পড়ে। ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে ধাপে ধাপে এই সীমা কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

ভারতে ৭৯৮টি লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে আইবিএআই। সংগঠনটির হিসাবে, ব্রোকার ও এজেন্টসহ বীমা বিক্রির সঙ্গে ৮৩ লাখের বেশি মানুষ যুক্ত। তবে তাদের সবাই ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের কর্মী নন।

সংগঠনটির আশঙ্কা, কমিশন কমলে ছোট ব্রোকার প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে গ্রাহক সংগ্রহ, পলিসি নবায়ন ও বীমার টাকা পেতে সহায়তার খরচ বহন কঠিন হতে পারে। এতে কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ বীমাসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সংগঠনটি ২০২৩ সালে চালু হওয়া পরিচালন ব্যয়ের নিয়ম ২০২৮ সালের নির্ধারিত পর্যালোচনা পর্যন্ত বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছে।

কমিশন ব্যয়ের পাশাপাশি গ্রাহকসেবার মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। আইআরডিএআই'র হিসাবে, নন-লাইফ বীমায় অভিযোগ ২০২২-২৩ অর্থবছরের ৭৮ হাজার ৩৪৭টি থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেড়ে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩৬১টিতে পৌঁছেছে। নিয়ন্ত্রকের অভিযোগ গ্রহণের পোর্টালে নন-লাইফ বীমার প্রায় ৬৯ শতাংশ অভিযোগই বীমার দাবি বা ক্ষতিপূরণ পাওয়া নিয়ে।

লাইফ বীমায়ও পলিসি চালু রাখার হার কম। নিয়ন্ত্রকের হিসাবে, পলিসি কেনার পাঁচ বছর পর চালু থাকার হার ছিল ৪৮ শতাংশ। তবে এসব সমস্যার জন্য অতিরিক্ত কমিশনই দায়ী, এমন প্রমাণ নেই।

ভারতের সংসদে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লাইফ বীমায় মোট পরিশোধিত অর্থের ৩৯ শতাংশ ছিল মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে পলিসি বন্ধ করে টাকা নেয়া ও অন্যান্য অর্থ উত্তোলনের জন্য। বিপরীতে মেয়াদপূর্তিতে দেয়া অর্থের অংশ ছিল ৩৭ শতাংশ। ২০২১-২২ অর্থবছরে পলিসি সমর্পণ ও উত্তোলনের অংশ ছিল ৩২ শতাংশ।

তবে এটি পলিসি বন্ধের হার নয়। আর্থিক সংকট, প্রিমিয়াম দিতে না পারা ও অনুপযুক্ত বীমা কেনার কারণেও গ্রাহক মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে টাকা তুলতে পারেন।

এসব সমস্যা কমাতে প্রতিটি পলিসির সঙ্গে বিক্রেতার পরিচয় যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ভুল তথ্য দিয়ে বীমা বিক্রি প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার কমিশন ফেরত নেয়ার কথাও বলা হয়েছে। এ ছাড়া কমিশনের তথ্য প্রকাশ এবং ব্যাংককর্মীদের বীমা বিক্রির পরিমাণভিত্তিক বোনাস ও বিদেশভ্রমণের মতো পুরস্কার বন্ধের প্রস্তাব রয়েছে।

তবে কমিশন কমলেই গ্রাহকের প্রিমিয়াম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। অন্যদিকে অনলাইনে সরাসরি বীমা কেনার সুযোগ বাড়লে বীমা বিক্রির খরচ কমতে পারে।

আইআরডিএআই'র চেয়ারম্যান অজয় শেঠ জানিয়েছেন, বিদ্যমান ব্যবসা ও জীবিকা যাতে ব্যাহত না হয়, সেদিকে নজর রেখে সংস্কার করতে চায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত বিবেচনা করেই প্রস্তাবিত কমিশনসীমা ও তা কার্যকরের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

মন্তব্য সমূহ (০)

আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:

এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

‌