নিজস্ব প্রতিবেদক: বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনাবেচার প্রতিষ্ঠান বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলারের সম্পদ চুরি হয়েছে। এত বড় ক্ষতি পূরণে কোনো বীমা কোম্পানির কাছ থেকে অর্থ পাওয়ার তথ্য নেই। বাইন্যান্স জানিয়েছে, চুরি হওয়া সম্পদের ঘাটতি নিজস্ব অর্থে পূরণ করছে প্রতিষ্ঠানটি। এ ঘটনায় ডিজিটাল সম্পদ চুরি হলে বীমা কতটা কাজে আসে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ইন্টারনেটভিত্তিক এক ধরনের ডিজিটাল মুদ্রা। এটি অনলাইনে কেনাবেচা ও অন্যের কাছে পাঠানো যায়। বিটকয়েন এর একটি পরিচিত উদাহরণ। এসব মুদ্রা কেনাবেচা ও সংরক্ষণের সেবা দেয় বাইন্যান্স।
গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) বাইন্যান্সে সাইবার হামলা চালায় হ্যাকাররা। যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, প্রায় ২০ মিনিটে ১০টি ব্লকচেইন নেটওয়ার্ক থেকে চুরি হওয়া সম্পদের বেশির ভাগ সরিয়ে নেয়া হয়। বাইন্যান্সের তদন্তে কর্মীর ল্যাপটপ আক্রান্ত হওয়াসহ হামলার একাধিক পথ শনাক্ত হয়েছে। তবে হামলার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই এ ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়াসংশ্লিষ্ট ট্রেডারট্রেইটর নামের একটি হ্যাকার গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে।
বীমাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্স্যুরার গত ৩০ অক্টোবর বাইন্যান্সের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির সাইবার বীমা নেই। তাদের জরুরি তহবিলেরও আলাদা কোনো বীমা বা পুনর্বীমা সুরক্ষা নেই বলে দাবি করেছে সূত্রটি। তবে বাইন্যান্স আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের জন্য আলাদা বীমা থাকলেও তা চুরি হওয়া সম্পদের ক্ষতিপূরণের জন্য নয়।
সাইবার বীমা হলো কম্পিউটার বা অনলাইন ব্যবস্থায় হামলার কারণে হওয়া নির্দিষ্ট ক্ষতি পূরণের বীমা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের বীমায় হামলার তদন্ত, আইনি খরচ ও ব্যবসা বন্ধ থাকায় হওয়া কিছু ক্ষতির জন্য অর্থ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু চুরি হওয়া ক্রিপ্টোসম্পদের পুরো মূল্য সাধারণত এর আওতায় থাকে না। এ জন্য বিশেষ ধরনের বীমা প্রয়োজন। সেখানেও ক্ষতিপূরণ নির্ভর করে বীমার শর্ত ও নির্ধারিত সীমার ওপর।
বাইন্যান্স জানিয়েছে, নিজস্ব অর্থে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের বিকল্প ক্রিপ্টোসম্পদ কিনেছে। এতে চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় ৯৫ শতাংশ ঘাটতি পূরণ হয়েছে। বাকি পাঁচ শতাংশ পূরণের কাজ চলছে। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় ৩০০ কোটি ডলারের চুরি হওয়া সম্পদ শনাক্ত ও আটকে রাখার কথা জানিয়েছে বাইন্যান্স। তবে আটকে রাখা সম্পদের সবটুকু উদ্ধার হয়নি। প্রকৃতপক্ষে কত অর্থ ফেরত পাওয়া গেছে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও প্রকাশিত হয়নি।
ক্ষতি পূরণে বাইন্যান্স তাদের নিজস্ব জরুরি তহবিল সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজার্স (সাফু), ফিউচারস ইন্স্যুরেন্স ফান্ড ও কোম্পানির অর্থ ব্যবহার করেছে। ১০০ কোটি ডলারের সাফু তহবিলের অর্ধেক ব্যবহারের কথা জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিপদের সময় গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণের জন্য এই তহবিল গঠন করা হয়। ফিউচারস ইন্স্যুরেন্স ফান্ডও বাইন্যান্সের নিজস্ব তহবিল। নামে ইন্স্যুরেন্স থাকলেও এটি কোনো বীমা কোম্পানির দেয়া পলিসি নয়। বাইন্যান্স সাফু তহবিল আবার আগের অবস্থায় ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এদিকে রোববার (১ নভেম্বর) বিটকয়েনসহ ১৫ ধরনের ক্রিপ্টোসম্পদ উত্তোলন ধাপে ধাপে চালু করে বাইন্যান্স। রয়টার্স জানিয়েছে, এরপর গ্রাহকেরা জমার তুলনায় ৩৬৪ কোটি ডলার বেশি তুলে নেন। তবে সোমবার (২ নভেম্বর) বাইন্যান্স জানিয়েছে, প্রথমে অর্থ উত্তোলন বেড়ে গেলেও পরে তা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, গ্রাহকদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং চুরির আর্থিক ক্ষতি তাদের বহন করতে হবে না।
এত বড় ক্ষতির বীমা দেয়া আন্তর্জাতিক বীমা কোম্পানিগুলোর জন্যও কঠিন। বিশেষায়িত বীমা প্রতিষ্ঠান রেলমের প্রধান নির্বাহী জোসেফ জিওলকোভস্কির মতে, সরাসরি ডিজিটাল সম্পদ চুরির ক্ষতিপূরণের বীমা এখনো সীমিত। লন্ডন ও বারমুডার কিছু বিশেষায়িত বীমাকারী এ ধরনের সেবা দেয়। পুনর্বীমার মাধ্যমে একাধিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঝুঁকি ভাগ করা গেলেও পুরো ক্ষতির জন্য পর্যাপ্ত বীমা পাওয়া সব সময় সম্ভব হয় না।
টিআরএম ল্যাবসের হিসাবে, ২০২৫ সালে ১৫০টি সাইবার হামলায় বিশ্বজুড়ে ২৮৭ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোসম্পদ চুরি হয়। এর মধ্যে বাইবিট নামের একটি প্রতিষ্ঠান থেকেই চুরি হয় ১৪৬ কোটি ডলার। বাইন্যান্সের একক ঘটনায় চুরির পরিমাণ আগের বছরের মোট চুরির দ্বিগুণের বেশি। এ ধরনের ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের বীমার চাহিদা বাড়াতে পারে। তবে বড় ক্ষতির ঝুঁকির কারণে বীমা কোম্পানিগুলো আরও সতর্ক হতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২৯ অক্টোবরের নির্দেশনায় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন ও তাতে সহায়তার ওপর ২০২২ সাল থেকে চালু থাকা বিধিনিষেধ বহাল রাখা হয়েছে। তবে বাইন্যান্সের ঘটনা দেশের বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও প্রাসঙ্গিক। সাইবার হামলায় কোন ক্ষতি বীমার আওতায় পড়বে, কত টাকা ক্ষতিপূরণ পাওয়া যাবে এবং বাকি ক্ষতি কীভাবে মেটানো হবে- এসব বিষয় আগেই যাচাই করার গুরুত্ব তুলে ধরেছে এ ঘটনা।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।