আবদুর রহমান আবির: বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), উপদেষ্টা ও এজেন্টসহ মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার আইডিআরএ’কে দেয়া হয়েছে বীমা আইনে। এর বাইরে অন্যকোন কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার দেয়া হয়নি বীমা খাতের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে।
অথচ এখন বীমা কোম্পানির প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা (সিএফও)-ও নিয়োগ দেবে আইডিআরএ। আইনকে পাশ কাটিয়ে এমন নির্দেশনা জারি করেছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) । বুধবার (২৮ অক্টোবর) “জিএডি সার্কুলার নম্বর- ২১/২০২৬” জারি করে এই নির্দেশনা দেয়া হয়।
এদিকে নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, নূন্যতম চার্টার্ড একাউন্টেন্ট না হলে কেউ বীমা কোম্পানির সিএফও পদে নিয়োগ পাবেন না। এমনকি কোন কোম্পানিতে সিএফও যদি চার্টার্ড একাউন্টেন্ট না হয়ে থাকেন- তাহলে তাকে বাদ দিয়ে একজন চার্টার্ড একাউন্টেন্টকে এ পদে নিয়োগ দিতে হবে।
এই যোগ্যতাসম্পন্ন সিএফও নিয়োগ সম্পন্ন করতে হবে আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে। এক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির বিদ্যমান সিএফও নির্ধারিত শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতাসম্পন্ন হলে আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তার অনুমোদনের জন্য আইডিআরএ’র কাছে আবেদন করতে হবে।
আইডিআরএ’র এমন নির্দেশনায় বিপাকে পড়েছে বীমা কোম্পানিগুলো। তাদের মতে, যে ধরণের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে সিএফও নিয়োগ দেয়ার কথা বলা হয়েছে- তা সব কোম্পানির জন্য বাস্তবসম্মত নয়। সিএফও নিয়োগের এই নির্দেশনায় কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নেয়া হয়নি।
এ ছাড়াও এতো অল্প সময়ের মধ্যে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন তারা। তাদের মতে, যদি কাউকে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয়ও- তিনি বছরের শেষ মুহুর্তে এসে কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে কতটা সক্ষম হবেন- তাও প্রশ্নবিদ্ধ।
আবার আইডিআরএ’র নির্দেশনা অনুসারে বিদ্যমান কোন সিএফও’কে বাদ দিতে হলেও মোটা অংকে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে পড়তে হবে সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানিকে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কোম্পানিতে ১০-২০ বছর ধরে একই ব্যক্তি সিএফও পদে আছেন; তাদের এই অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। এক্ষেত্রে কোম্পানির প্রয়োজনে তাদের জন্য ছাড় দিতে হবে। তা না হলে, এ খাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।
আইডিআরএ’র এই সার্কুলার জারির আগে দেশের বীমা খাতের উন্নয়নে ২০১০ সালে প্রণয়ন করা বীমা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সরকার। খসড়া সংশোধনীতে ১১টি নতুন ধারা সংযোজন এবং ৪টি ধারা বিয়োজনসহ সর্বমোট ৪৯টি ধারা-উপধারা ও তফসিলে সংশোধন আনার প্রস্তাব করা হয়।
এক্ষেত্রে উপদেষ্টা বা কনসালটেন্ট নিয়োগের ধারা সংশোধনসহ আইনে নতুন ধারা সংযোজন করে বীমা কোম্পানির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) এবং কোম্পানি সচিব (সিএস) নিয়োগে আইডিআর'র অনুমোদন নেয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপের প্রস্তাব করা হয়। তবে সেই খসড়া চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সিএফও নিয়োগে আইডিআরএ’র অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হলো।
উল্লেখ্য, বীমা আইন ২০১০ এর ৮০ ধারায় ‘মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা’; ৮১ ধারায় ‘উপদেষ্টা’; ১২৪ ধারায় ‘এজেন্ট’; ১২৫ ধারায় ‘এজেন্ট নিয়োগকারী’; ১২৬ ধারায় ‘ব্রোকার’ এবং ১২৭ ধারায় ‘জরিপকারী’ নিয়োগের এখতিয়ার দেয়া হয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইডিআরএ’কে।
সিএফও নিয়োগে যেসব যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে আইডিআরএ’র সার্কুলারে
বীমা কোম্পানির সিএফও পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ৭ ধরণের শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের নতুন এই সার্কুলারে। সেগুলো হলো-
আইসিএবি’র ফেলো বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য; আইসিএমএবি’র ফেলো বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য; ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলসের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস এর ফেলো বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য; যুক্তরাষ্ট্র বা কানাডা থেকে সনদপ্রাপ্ত সার্টিফাইড পাবলিক অ্যাকাউন্ট্যান্টস (সিপিএ); যুক্তরাজ্যের এসোসিয়েশন অব চার্টার্ড সার্টিফাইড অ্যাকাউন্ট্যান্টস (এসিসিএ)’র ফেলো বা অ্যাসোসিয়েট সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের চার্টার্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্ট (সিএফএ) সনদপ্রাপ্ত।
এছাড়াও বিদেশের অন্য কোনো হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পেশাগত সনদ, যা আইসিএবি বা আইসিএমএবি কর্তৃক স্বীকৃত।
যা বলছেন বীমা কোম্পানিগুলোর মুখ্য নির্বাহীরা
সিএফও নিয়োগের বিষয়ে আইডিআরএ’র জারি করা সার্কুলার নিয়ে দেশের লাইফ ও নন-লাইফ বীমা কোম্পানির বেশ কয়েকজন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করেছে ইন্স্যুরেন্স নিউজ বিডি। আলাপকালে মুখ্য নির্বাহীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন।
সিএফও’র শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক হওয়ার বিষয়টিকে সবাই ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এটি বাস্তবায়নের টাইমফ্রেম এবং কোম্পানিগুলোর আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় না নেয়ায় নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন তারা। এ ছাড়াও সিএফও নিয়োগে আইডিআরএ’র অনুমোদন নেয়ার বিষয়টিকেও অনেকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন।
এ বিষয়ে সেনা ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. শফিক শামীম বলেন, বীমা কোম্পানিতে যোগ্যতাসম্পন্ন সিএফও নিয়োগ দেয়ার এই উদ্যোগ ভালো। তবে এক মাসের মধ্যে এই যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি আমরা কোথায় পাব- সেটি আমাদের বিবেচনা করতে হবে!
তিনি বলেন, দেশের বীমা খাতে এমন যোগ্যতাসম্পন্ন সিএফও হয়তো ২/১টি কোম্পানিতে আছে; বাকীদের পক্ষে এটি এতো অল্প সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজনে টাইমফ্রেম বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানিতে সিএফও পদে একই ব্যক্তি ১০-২০ বছর ধরে আছেন; তাদের এই অভিজ্ঞতাকে আমাদের অবশ্যই মূল্যায়ন করতে হবে। কোম্পানির প্রয়োজনে তাদের জন্য ছাড় দিতে হবে। তা না হলে, এ খাতে দক্ষ জনবল ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।
বীমা কোম্পানিতে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) নিয়োগের ক্ষেত্রে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা আরোপের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন বেঙ্গল ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এম এম মনিরুল আলম।
তিনি মনে করেন, এই নতুন নিয়মের ফলে বীমা খাতের আর্থিক লেন-দেন, বীমা আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন ও গ্রাহক ও শেয়ারহোল্ডারদের আর্থিক নিরাপত্তা বিধানে আরো সহায়ক হবে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক। একই সাথে, এই বাধ্যবাধকতার কারণে কোম্পানিগুলোতে প্রকৃত যোগ্যতা ও দক্ষতাসম্পন্ন সিএফও পাওয়ার বড় সুযোগ তৈরি হবে।
এম এম মনিরুল আলম আরও উল্লেখ করেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার এই অনুমোদনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সিএফও নিয়োগের ফলে তার স্বাধীনভাবে পেশাগত দায়িত্ব পালন সহজ হবে, যা সামগ্রিকভাবে বীমা খাতের সুশাসন ও আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আইডিআরএ’র নতুন সার্কুলারটি ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন শান্তা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নাফিস এ আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে সংকটে থাকা বীমা কোম্পানিগুলোর এই অবস্থার পেছনে সিএফও বা ফাইন্যান্সিয়াল হেডের ভুল সিদ্ধান্ত ও অনভিজ্ঞতার বড় ভূমিকা রয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে সিএ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা কম হওয়ায় তাদের বেতন অনেক বেশি হবে। ফলে কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় নিশ্চিতভাবেই বাড়বে। এটি কীভাবে সামলানো হবে, তা নিয়ে এখনই পরিকল্পনা করা দরকার।
তার মতে, আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিকল্পনার জায়গা হলো সময়সীমা। বর্তমানে যেই সিএফও’রা আছেন, তাদের জন্য আইডিআরএ’র সকল শর্ত পরিপালন করার সময়সীমা খুবই সীমিত; এটি বাড়িয়ে কমপক্ষে ৬ মাসের একটি বাস্তবসম্মত সময় বরাদ্দ করা উচিত।
সিএফও নিয়োগের ক্ষেত্রে শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করে জারি করা সার্কুলারকে অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উল্লেখ করে চার্টার্ড লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক মুখ্য নির্বাহী এস এম জিয়াউল হক বলেন, বীমা খাতে আর্থিক শৃঙ্খলা ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সিএফও পদে প্রাতিষ্ঠানিক ও পেশাগত যোগ্যতার কোনো বিকল্প নেই।
তিন বলেন, একটি বীমা কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব, সঠিক বিনিয়োগ এবং স্বচ্ছ হিসাবরক্ষণ সম্পূর্ণভাবে সিএফও’র দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। সিএফও যদি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পেশাগত যোগ্যতাসম্পন্ন না হন, তবে পুরো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত নড়বড়ে হয়ে পড়ে।
বাস্তবতা হলো, যোগ্য সিএফও’র অভাব ও অদক্ষতার কারণে বীমা খাতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের নজির রয়েছে। নাম প্রকাশ না করে তিনি একটি লাইফ বীমা কোম্পানির দু’টি বড় আর্থিক ব্যর্থতার ঘটনা তুলে ধরেন, যার জন্য তৎকালীন সিএফও’র অযোগ্যতাই দায়ী ছিল। একজন দূরদর্শী ও পেশাগতভাবে দক্ষ সিএফও থাকলে এই দুটি বড় বিপর্যয় অনায়াসেই এড়ানো যেত বলে মনে করেন তিনি।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।