আন্তর্জাতিক বীমা ডেস্ক: আর্থিক সংকটে পড়া বীমা কোম্পানি বন্ধ, পুনর্গঠন বা অন্য প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরের বিশেষ জরুরি প্রক্রিয়া প্রায় ১৫০ দিন থেকে তিন-চার দিনে নামিয়ে আনতে চায় দক্ষিণ কোরিয়া। এ জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার নতুন নিয়মের প্রস্তাব দিয়েছে দেশটির আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা। উদ্দেশ্য, একটি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সংকট অন্য প্রতিষ্ঠানে ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো এবং গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষা করা।
দক্ষিণ কোরিয়ার ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস কমিশন (এফএসসি) গত ২৯ অক্টোবর এ প্রস্তাব ঘোষণা করে। নতুন নিয়ম বীমা কোম্পানির পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। তবে পুনর্বীমা কোম্পানি এর বাইরে থাকবে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, গুরুতর সংকটে পড়া কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে প্রচলিত আইনের কিছু শর্ত শিথিল করা যাবে। বর্তমানে এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে আগাম নোটিশ, শুনানি ও বিভিন্ন অনুমোদনসহ কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হয়। নতুন নিয়মে জরুরি পরিস্থিতিতে এসব ধাপের কিছু বাদ দেয়া যাবে। প্রতিষ্ঠান একীভূত করার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৯০ দিনের সরকারি পর্যালোচনাও বাদ দেয়া যাবে। প্রয়োজনে দরপত্র ছাড়াই হস্তান্তরের চুক্তি করা যাবে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দেনার প্রাথমিক হিসাব এক থেকে দুই দিনের মধ্যে শেষ করে পরে বিস্তারিত যাচাই করা হবে।
তবে সব সংকটে পড়া প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এ ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। কোনো প্রতিষ্ঠান দেউলিয়া হলে বা হওয়ার ঝুঁকিতে পড়লে এবং সেই সংকট পুরো আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি তৈরি করলেই বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া যাবে। প্রচলিত নিয়মে সংকট ঠেকানো সম্ভব না হওয়াও একটি শর্ত। কোনো প্রতিষ্ঠানকে এ ব্যবস্থার আওতায় আনতে কমিশনের অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি লাগবে।
বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় সংকটে পড়া কোম্পানির কার্যক্রম স্থগিত, প্রশাসক নিয়োগ, গ্রাহকদের বীমা পলিসি অন্য প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর, কোম্পানির মূলধন কমানো কিংবা ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি বাতিল করা যাবে। তবে এ প্রস্তাবের আওতায় গ্রাহকদের বকেয়া বীমা দাবি ও অন্যান্য পাওনা কীভাবে পরিশোধ করা হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
কোম্পানির মালিকপক্ষ ও পাওনাদারদের জন্যও সুরক্ষার প্রস্তাব রয়েছে। বিশেষ ব্যবস্থায় তারা সাধারণ নিয়মে কোম্পানি বন্ধ করার তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেই বাড়তি ক্ষতির ক্ষতিপূরণ পাবেন। স্বাধীন মূল্যায়নের ভিত্তিতে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। ক্ষতিপূরণের অর্থ আসবে দেশটির আমানত বীমা তহবিল থেকে।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সংকটে পড়া বীমা কোম্পানির সমস্যা সমাধানে দেরির একটি উদাহরণ এমজি নন-লাইফ ইন্স্যুরেন্স। ২০২২ সালে আর্থিকভাবে দুর্বল ঘোষিত কোম্পানিটি বিক্রির একাধিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। পরে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার গ্রাহকের বীমা পলিসি একটি অন্তর্বর্তী বীমা প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এতে পলিসির আগের শর্ত বহাল রেখে বীমা সুরক্ষা ও দাবি পরিশোধ চালু রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
নতুন নিয়ম চালু করতে দক্ষিণ কোরিয়ার দুটি আইন সংশোধনের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এর একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং অন্যটি আমানতকারীদের সুরক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ বিষয়ে ২ নভেম্বর থেকে মতামত নেয়া শুরু হয়েছে, চলবে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত। মতামত পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় অনুমোদনের পর আইন সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে তোলা হবে। বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার ছয় মাসের মধ্যে এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রতিবেদন দিতে হবে।
বাংলাদেশের বীমা আইন, ২০১০-এও বীমা ব্যবসা একীভূত ও হস্তান্তরের বিধান রয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকদের স্বার্থ ঝুঁকিতে পড়লে বীমা কোম্পানিকে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ স্থগিত ও প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। প্রশাসক কোম্পানির ব্যবসা চালু রাখা, অন্য প্রতিষ্ঠানে হস্তান্তর বা বন্ধ করার বিষয়ে সুপারিশ করতে পারেন। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবের মতো তিন-চার দিনের বিশেষ প্রক্রিয়া বাংলাদেশের বীমা আইনে নির্ধারিত নেই।
আপনার একটি মন্তব্য লিখুন:
এখনো কোনো মন্তব্য করা হয়নি।